শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬ | Boydton |
| Boydton
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

সীতাকুণ্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু

- ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৯ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে অন্তত আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও এক ডজনের বেশি শ্রমিক। বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা এটি।

শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় ভাটিয়ারী এলাকায় ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের জাহাজে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রথম দিকে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও জাহাজের ভেতর থেকে আরও শ্রমিককে উদ্ধার এবং গুরুতর অসুস্থদের হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।

ফেরদৌস স্টিলের প্রকল্প কর্মকর্তা মো. শাহিন নয়জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ঘটনায় অন্তত ১৪ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের কয়েকজনকে প্রথমে ভাটিয়ারীর বিএসবিএ হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়।

নিহতদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে চারজনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই ভাই মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। তারা সবাই ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।

স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজ থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত গ্যাস

ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির কারণে ইয়ার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ছিল। তা সত্ত্বেও দুর্ঘটনার সময় সেখানে শ্রমিকদের উপস্থিতি এবং জাহাজে কাজ চলার তথ্য পাওয়া গেছে।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইউসুফ বলেন, “আজ শুক্রবার, তাই ইয়ার্ড বন্ধ।” তার ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ৯টার দিকে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের একটি ট্যাংকে লিকেজ থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে।

অন্য কয়েকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, শ্রমিকেরা জাহাজ ভাঙার কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত একটি গ্যাস পাইপ কাটা পড়ে। এরপর দ্রুত বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে।

তবে ঠিক কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং ছড়িয়ে পড়া গ্যাসে কোন কোন রাসায়নিক উপাদান ছিল, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

গ্যাসের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে আশপাশের এলাকাতেও এর প্রভাব অনুভূত হয়। স্থানীয় এক জেলে দ্য ভয়েসকে জানান, সাগর থেকে ফেরা নৌকাগুলো দুর্গন্ধের কারণে ইয়ার্ডসংলগ্ন খালের কাছে ভিড়তে পারেনি। প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে তাদের তীরে উঠতে হয়।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। পরে তারা জাহাজের ভেতরে ঢুকে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করেন।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানান, যে জাহাজটি ভাঙা হচ্ছিল সেটি আগে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে যথাযথ প্রক্রিয়ায় গ্যাসমুক্ত করা বাধ্যতামূলক।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের জাহাজের ট্যাংকে কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিপজ্জনক গ্যাস থেকে যেতে পারে।

শুক্রবার দুর্ঘটনাস্থলে প্রাথমিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তৌফিকুল ইসলাম বলেন, “জাহাজটি কাটার আগে অবশ্যই গ্যাসমুক্ত করতে হবে।”

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতিকেও দায়ী করেন এই ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, “কারখানা কর্তৃপক্ষ ট্যাংকগুলো গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ ভাঙার কাজ শুরু করেছিল এবং সেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল খুবই দুর্বল। এ কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।”

চমেকে ছয়জনকে মৃত অবস্থায় নেওয়া হয়

দুর্ঘটনার পর হতাহত শ্রমিকদের হাসপাতালে নেওয়া শুরু হলে প্রাণহানির ভয়াবহতা স্পষ্ট হতে থাকে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. ইশতিয়াক রহমান জানান, ইয়ার্ড থেকে দুই দফায় সাতজনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল।

শুক্রবার হাসপাতালের পরিস্থিতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “তাদের ছয়জনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে। মরদেহগুলো মর্গে রাখা হয়েছে। অন্য একজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।”

এ সময় সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আলমগীর জানান, দুর্ঘটনাস্থলে আরও দুটি মরদেহ ছিল। এতে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় আটজনে।

আহত আরও কয়েকজন চিকিৎসাধীন থাকায় হতাহতের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ছুটির দিনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ কেন, উঠছে প্রশ্ন

দুর্ঘটনার পর বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে—শুক্রবার ইয়ার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ থাকলে স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে শ্রমিকেরা কী কাজ করছিলেন এবং সেই কাজের অনুমতি কে দিয়েছিল।

ইয়ার্ড মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন দ্য ভয়েসকে জানান, বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকদের হতাহতের খবর তিনি পেয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটির পেছনে অবহেলার কথা তাকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। দুর্ঘটনার সময় তিনি ইয়ার্ডে ছিলেন না এবং ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর বিস্তারিত জানাতে পারবেন বলে জানান।

একই ইয়ার্ডে আগেও দুর্ঘটনা

ফেরদৌস স্টিলের এই ইয়ার্ডে আগেও গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর সেখানে একটি তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণে আট শ্রমিক দগ্ধ হন।

সীতাকুণ্ডের অন্যান্য জাহাজভাঙা ইয়ার্ডেও একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এসএন করপোরেশনের একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিস্ফোরণে ১২ শ্রমিক আহত হন। পরে তাদের ছয়জন মারা যান।

এ ধরনের দুর্ঘটনার পর বারবারই জাহাজের গ্যাসমুক্ত সনদ, বিপজ্জনক পদার্থ ব্যবস্থাপনা, আগুন বা স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন কাজের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, শ্রমিক প্রশিক্ষণ এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যেও থামছে না মৃত্যু

সীতাকুণ্ডের সর্বশেষ দুর্ঘটনাটি ঘটল জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি কার্যকর হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পর।

হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপস ২০২৫ সালের ২৬ জুন কার্যকর হয়। বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক চুক্তির সদস্য।

জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে শ্রমিক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ যেন অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মুখে না পড়ে, সে জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে এই কনভেনশন।

এর আওতায় অনুমোদিত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা এবং নিয়মিত নজরদারিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিকল্পনা থাকার কথা।

কোনো জাহাজ ভাঙার আগেই সেই জাহাজের জন্য আলাদা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ পরিকল্পনা থাকার পাশাপাশি জাহাজে থাকা বিপজ্জনক পদার্থের তালিকাও সংরক্ষণের বিধান রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ‘গ্রিন’ শিপ রিসাইক্লিং ব্যবস্থায় রূপান্তরের মধ্যেও বাংলাদেশের এ শিল্পে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা থামেনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জাহাজভাঙা শিল্পে অন্তত ২৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে তিন শ্রমিক নিহত, ১০ জন গুরুতর আহত এবং আরও ১৫ জন মাঝারি ধরনের আঘাত পেয়েছেন।

এসব দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশই ভারী লোহার অংশ পড়ে যাওয়া, ক্রেন ও তার-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা অথবা গ্যাস বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিলসের হিসাবে, ২০২৪ সালে জাহাজভাঙা শিল্পে সাতজন এবং ২০২৫ সালে চারজন শ্রমিক মারা যান। সে হিসাবে শুক্রবার ফেরদৌস স্টিলের একটি দুর্ঘটনায় নয়জনের মৃত্যু আগের দুই বছরের যেকোনো এক বছরে পুরো খাতে রেকর্ড করা মৃত্যুর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

‘বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য’

শ্রমিক অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, জাহাজভাঙা শিল্পের অনেক দুর্ঘটনাকে ভারী শিল্পের অনিবার্য ঝুঁকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে এর বড় অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

গত জুলাইয়ে বিলসের ছয় মাসের পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্য ফজলুল কবির মিন্টু দ্য ভয়েসকে বলেন, “বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য।”

তিনি আরও বলেন, “সাধারণত মৌলিক নিরাপত্তা পদ্ধতি উপেক্ষা করা হলে অথবা যথাযথভাবে কার্যকর না করলেই এসব দুর্ঘটনা ঘটে।”

তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, তদারকি ও প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের বিপজ্জনক কাজে পাঠানো হয়।

জাহাজভাঙা শিল্প বিশেষজ্ঞ এবং ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের অ্যাডভোকেসি প্রধান মুহাম্মদ আলী শাহীনও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর প্রয়োগ ও নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং শ্রমিক ও পরিবেশ—উভয়কে সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, ধারাবাহিক নজরদারি এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি অপরিহার্য।”

মন্তব্য

Scroll to Top