শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

জামায়াত নেতার মাদ্রাসা থেকে সরকারি ধানের ১৩ বস্তা বীজ উদ্ধার

- ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:২০ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় স্থানীয় এক জামায়াতে ইসলামী নেতার পরিচালিত মাদ্রাসা থেকে কৃষকদের বিনামূল্যে বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা ১৩ বস্তা সরকারি আমন ধানের বীজ উদ্ধার করেছে উপজেলা প্রশাসন। নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ দিন পরও বীজগুলো কৃষকদের হাতে না পৌঁছে মাদ্রাসায় পড়ে থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের জামেউল উলুম মাদ্রাসা পরিদর্শনে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজিদ-বিন-আকন্দ। পরিদর্শনের সময় তিনি মাদ্রাসার সুপারের কার্যালয়ের পাশের একটি কক্ষ তালাবদ্ধ দেখতে পান। কক্ষটি খোলার নির্দেশ দিলে ভেতর থেকে সরকারি আমন ধানের বীজের বস্তা পাওয়া যায়।

মোট ১৩ বস্তা বীজ উদ্ধার করা হয়। পরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেগুলো কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

মাদ্রাসাটির ভারপ্রাপ্ত সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শামসুল ইসলাম হেলালী। তিনি একই সঙ্গে চরম্বা ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির।

কারণ দর্শানোর নোটিশ

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদ-বিন-আকন্দ জানান, সরকারি বীজ মাদ্রাসায় কীভাবে গেল এবং কেন সেগুলো নির্ধারিত সময়ে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়নি—এ বিষয়ে মাদ্রাসার সুপারের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “মাদ্রাসা থেকে উদ্ধারের পর বীজগুলো কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। সরকারি বীজের বস্তা মাদ্রাসায় কীভাবে গেল, তা জানতে সুপারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।”

ইউএনও আরও বলেন, “জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

এ ঘটনায় এখনো কোনো ফৌজদারি মামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসন কিছু জানায়নি। তদন্তের মাধ্যমে বীজের দায়িত্ব কার কাছে ছিল, কীভাবে সেগুলো মাদ্রাসায় রাখা হলো এবং বিলম্বের পেছনে অবহেলা, অনিয়ম বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখা হবে।

২০ দিন আগে দেওয়া হয়েছিল বীজ

লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম জানান, সরকারি কর্মসূচির আওতায় এসব বীজ প্রায় ২০ দিন আগে কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, “সরকারি বীজগুলো বিনামূল্যে ২০ দিন আগে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করেছি। উপজেলা সদর থেকে চরম্বা ইউনিয়ন দূরে হওয়ায় কৃষকদের দুজন প্রতিনিধির মাধ্যমে বীজগুলো পাঠানো হয়েছিল।”

তার ধারণা, ওই প্রতিনিধিরাই হয়তো কৃষকদের মধ্যে বীজ বিতরণ না করে মাদ্রাসায় রেখে দিয়েছিলেন।

কাজী শফিউল ইসলাম বলেন, “বীজগুলো ১৫ দিন আগে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করার কথা ছিল। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”

কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, উপজেলা কৃষি অফিস সরাসরি মাদ্রাসাকে বীজ সংরক্ষণের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেনি। বরং স্থানীয় কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বীজ পাঠানো হয়েছিল।

ফলে এখন তদন্তের অন্যতম বিষয় হলো—উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বীজ ছাড় হওয়ার পর সেগুলো কার হেফাজতে ছিল এবং কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না।

‘ব্যস্ততার কারণে বিতরণ করা হয়নি’

চরম্বা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ও মাদ্রাসাটির ভারপ্রাপ্ত সুপার শামসুল ইসলাম হেলালী স্বীকার করেছেন, সরকারি বীজের বড় একটি অংশ মাদ্রাসায় রাখা হয়েছিল।

তিনি বলেন, “সরকারিভাবে কৃষকদের বিতরণের জন্য ১৭ বস্তা বীজ দেওয়া হয়েছিল। চার বস্তা বিতরণ করা হয়েছে, বাকি বীজ মাদ্রাসায় রাখা হয়েছিল।”

বাকি বীজ কৃষকদের মধ্যে কেন বিতরণ করা হয়নি—এ প্রশ্নে তিনি ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করেন।

হেলালী বলেন, “ব্যস্ততার কারণে আর বিতরণ করা হয়নি।”

তার বক্তব্য অনুযায়ী, মোট ১৭ বস্তার মধ্যে চার বস্তা কৃষকদের কাছে পৌঁছেছিল, আর বাকি ১৩ বস্তা মাদ্রাসায় রয়ে যায়।

তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য প্রকাশ হয়নি যে, বীজগুলো বিক্রি করা, আত্মসাৎ করা কিংবা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে মাদ্রাসায় রাখা হয়েছিল। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং প্রশাসন জানিয়েছে, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব ও তদন্তের ফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কৃষকদের সহায়তার বীজ, তবু পৌঁছায়নি সময়মতো

সরকারি কৃষি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন মৌসুমে কৃষকদের বিনামূল্যে বা প্রণোদনার অংশ হিসেবে বীজ দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো চাষাবাদের ব্যয় কমানো, উৎপাদন বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট মৌসুমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা।

এই ধরনের বীজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কৃষকের হাতে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মৌসুমি ধানের বীজ যথাসময়ে বিতরণ না হলে বীজতলা তৈরি ও রোপণের সময়সূচি বিঘ্নিত হতে পারে।

লোহাগাড়ার ঘটনায় কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বীজগুলো অন্তত ১৫ দিন আগেই কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করার কথা ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৩ বস্তা বীজ মাদ্রাসার একটি কক্ষে পড়ে ছিল।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যেসব কৃষকের জন্য এসব বীজ বরাদ্দ করা হয়েছিল, তারা প্রয়োজনের সময়ে সরকারি সহায়তা পেয়েছেন কি না।

ঘটনাটি সরকারি কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থার তদারকি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে সরকারি দপ্তর থেকে সরাসরি সুবিধাভোগীর হাতে না দিয়ে স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বীজ পাঠানো হলে সেগুলো যথাসময়ে নির্ধারিত কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

উপজেলা প্রশাসন আপাতত উদ্ধার করা বীজ কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেছে। তবে সেগুলো কেন এতদিন মাদ্রাসায় রাখা হয়েছিল এবং এর জন্য কার দায় রয়েছে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

তদন্ত এবং কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবের পরই এ বিষয়ে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ স্পষ্ট হবে।

মন্তব্য

Scroll to Top