সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাতিল হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভিসা দ্রুত পুনর্বহাল ও নবায়নের জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে প্রবাসীদের একটি সংগঠন। সংগঠনটির আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে অনেক প্রবাসী চাকরি হারাতে পারেন এবং তাদের পরিবার গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।
‘প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ নামের সংগঠনটি মঙ্গলবার ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায়।
সংগঠনটির সহকারী সেক্রেটারি মো. শরিফ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত বা ছুটিতে দেশে এসে ভিসা জটিলতায় পড়া বাংলাদেশিদের বর্তমান পরিস্থিতি, ভিসা বাতিল, কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি এবং আর্থিক ও পারিবারিক সমস্যার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
সংগঠনটি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের ভিসা দ্রুত পুনর্বহাল বা নবায়নের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত বক্তব্য অনুযায়ী, ভিসা জটিলতার কারণে অনেক প্রবাসীর চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের পরিবারও আর্থিক চাপে পড়েছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত অনেক পরিবারের দৈনন্দিন খরচ, সন্তানদের শিক্ষা এবং অন্যান্য ব্যয় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল।
মো. শরিফ সমস্যা সমাধানে সরকারের চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন এবং এসব প্রচেষ্টা আরও দ্রুত ও কার্যকর করার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে মো. শহীদুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলাম বক্তব্য দেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যেও অনেকের আবাসিক ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশের পর গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
২০২৪ সালের প্রবাসী বিক্ষোভের ছায়া
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত কিছু বাংলাদেশি দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে অংশ নেন। ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ-ইউএই অভিবাসন সম্পর্কও এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুমতি ছাড়া প্রকাশ্য বিক্ষোভ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ৫৭ বাংলাদেশিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ১০ বছর থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ওই ৫৭ বাংলাদেশিকে ক্ষমা করে দেন। ক্ষমার ফলে তাদের সাজা বাতিল হয় এবং তাদের সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা ছিল।
সরকার বলছে, ৬২৬ বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হয়েছে
বাংলাদেশ সরকার গত মাসের শেষ দিকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আনার পর ভিসা সমস্যার প্রকৃত পরিসর আরও স্পষ্ট হয়।
গত ৩০ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬২৬ বাংলাদেশির ভিসা ‘অটো-ক্যানসেল’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে। এ সংখ্যা নিয়ে আগে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হওয়ার যে তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়েছিল, তিনি তা নাকচ করেন।
পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর সাংবাদিকদের শামা ওবায়েদ বলেন, “আমাদের দূতাবাস এবং ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আজকের আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক পর্যন্ত প্রকৃত সংখ্যা ৬২৬।”
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূরও সম্প্রতি জানান, ছুটিতে দেশে ফেরার পর যেসব কর্মীর ইউএই ভিসা বাতিল হয়েছে, তাদের জন্য বাংলাদেশে একটি বিশেষ হটলাইন চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শ্রমিকদের জন্য পরিণতি হতে পারে গুরুতর
প্রবাসী কর্মীদের জন্য ভিসা সমস্যা কেবল একটি প্রশাসনিক বা কাগজপত্রের জটিলতা নয়।
আবাসিক বা কর্মসংস্থান ভিসা নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে একজন কর্মীর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশটিতে বৈধভাবে কাজ করা বা পরিবারের জন্য আয় চালিয়ে যাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বিদেশে যাওয়ার জন্য যারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, তাদের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। হঠাৎ কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে তাদের আর্থিক ক্ষতি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশের প্রবাসী অর্থনীতিতে ইউএই গুরুত্বপূর্ণ
ভিসা জটিলতার বিষয়টি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স অর্থনীতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ হওয়ায় এর প্রভাব আরও বিস্তৃত।
জুলাইয়ে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশ মোট ৩২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। এর প্রায় ৬২ শতাংশ এসেছে পাঁচটি দেশ থেকে—সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র।
ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে বাধা সৃষ্টি হলে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে দেশে থাকা পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘদিন ধরেই বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করছেন। তাদের মধ্যে নির্মাণ ও সেবা খাতের কর্মী যেমন আছেন, তেমনি পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং গৃহকর্মীরাও রয়েছেন।
দুই দেশের শ্রমবাজারসংক্রান্ত সম্পর্কও বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে সময়ে সময়ে বিকশিত হয়েছে। ২০১৮ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নিয়োগের বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাংলাদেশ একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে।
ওই সমঝোতায় কর্মসংস্থান চুক্তি, বেতন, সুযোগ-সুবিধা, আবাসন এবং লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দ্রুত সমাধানের দাবি
এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনাকে দ্রুত বাস্তবসম্মত ফলাফলে রূপ দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
‘প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা’র প্রধান দাবি হলো, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে না রেখে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের ভিসা যত দ্রুত সম্ভব পুনর্বহাল ও নবায়নের ব্যবস্থা করা।
সংগঠনটি চায়, সরকার এ সমস্যাকে জরুরি শ্রম ও অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করুক। কারণ দীর্ঘসূত্রতা চলতে থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রবাসীরা চাকরি হারাতে পারেন, ঋণের বোঝা বাড়তে পারে এবং তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।

মন্তব্য