ঢাকা: বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২১৮ জন। তাদের মধ্যে ২০১ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও ১ হাজার ১৭ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবার প্রকাশিত নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
সর্বশেষ তিন শিশুর মৃত্যুর ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬০ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৬ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৬৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিন শিশুর কারও শরীরে হাম নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। তারা হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। মৃতদের মধ্যে দুজন সিলেটের এবং একজন ময়মনসিংহের।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, কয়েক মাস ধরে চলা সংক্রমণ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আক্রান্ত ও উপসর্গ থাকা রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
কয়েক দিনের ব্যবধানে মৃত্যু বেড়েছে ২০
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আগের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৮৪০। সে সময় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছিল ১৬ হাজার ১৮০ শিশু এবং হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৬১ শিশুর মধ্যে।
সর্বশেষ হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৮৬০ হয়েছে। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে আরও ২০ শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে।
একই সময়ে নিশ্চিত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ১৬ হাজার ৭৪০ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। আর হামের উপসর্গ দেখা গেছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩৮ জনের মধ্যে।
দুই শ্রেণি মিলিয়ে এ সময়ে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৭৮ জনে।
আগস্টের শুরুতে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪১। সেই হিসাবে কয়েক দিনের মধ্যে নিশ্চিত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সম্মিলিত সংখ্যা ৫ হাজার ১৩৭ জন বেড়েছে।
তবে নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গ—এই দুটি শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন বা মারা যাওয়া প্রত্যেক শিশুর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে, এমন নয়। এ কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গ থাকা রোগীর তথ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ করছে।
ফরিদপুরে আক্রান্ত বেড়ে ৪ হাজার ৩০৬
দেশের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে ফরিদপুরে হামের সংক্রমণ এখনো উচ্চমাত্রায় রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলাটিতে নতুন করে ৪০ জন আক্রান্ত হয়েছে।
এর ফলে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত ফরিদপুরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ৩০৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
তবে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলায় হামে নতুন করে কারও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে চলতি বছরে ফরিদপুরে হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২১ জনেই রয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন আক্রান্ত ৪০ জনের মধ্যে ৩১ জনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং নয়জনকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে শনাক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে দুই হাসপাতালে মোট ৯৯ জন চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬৯ জন এবং ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ৩০ জন ভর্তি রয়েছে।
একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ২৮ জন হাসপাতাল ছেড়েছে।
আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছে।”
শিশুদের ওপর সংক্রমণের চাপ বেশি
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া বা প্রয়োজনীয় দুই ডোজ টিকা সম্পন্ন না করা শিশুদের জন্য এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) চলতি বছরের এপ্রিলে জানায়, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছিল। তখন সংস্থাটি জানিয়েছিল, সন্দেহভাজন মৃত্যুর বড় অংশই ছিল দুই বছরের কম বয়সী টিকা না নেওয়া অথবা অসম্পূর্ণ টিকা পাওয়া শিশু।
বাংলাদেশে হামের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে ডব্লিউএইচওর ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়কারী ডা. জাহাঙ্গীর আলম এপ্রিলে সতর্ক করে বলেছিলেন, “হাম সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। টিকাদানের আওতায় সামান্য ঘাটতিও প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে। টিকার বাইরে থেকে যাওয়া প্রতিটি শিশুই ঝুঁকি বাড়ায়, অথচ এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হাম-রুবেলার প্রথম ডোজ টিকার আওতা ২০১৯ সালে ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ থাকলেও ২০২৩ সালে তা ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে দ্বিতীয় ডোজের আওতা ৮৯ শতাংশ থেকে কমে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়।
ইউনিসেফ বলছে, জনগোষ্ঠীর মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়া কার্যকরভাবে ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।


