ঢাকা: দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে ৯০২-এ পৌঁছেছে।
ইউনিসেফের অনুরোধ উপেক্ষা করে মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ করায় এভাবে শিশু মৃত্যু ঘটছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলের কর্মসূচী হওয়ায় ইউনিসেফের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সংগ্রহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ইউনুসের আমলে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শনিবার বিকেলে প্রকাশিত নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৯৮ জন নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭০ শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে, আর ৭২৮ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ আটজনের সবাই হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৮০৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ৯৯ শিশু। দুই শ্রেণি মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা এখন ৯০২। নিশ্চিতভাবে হাম সনাক্ত না হলে কিভাবে শিশুরা এভাবে মারা যাচ্ছে, কোন রোগে তারা আক্রান্ত হচ্ছে এর কোনো জবাব সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে না।
২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি আরও ৭০০ শিশু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, চলমান প্রাদুর্ভাব এখনো দেশের হাসপাতালগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭০০ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ৫৪৯ শিশু হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৭৬ সন্দেহভাজন হাম রোগী এবং ১৭ হাজার ৮০০ নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। দুই শ্রেণি মিলিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৭৬।
এই সময়ের মধ্যে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৯৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৯ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে।
অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা থামেনি।
দ্রুত বাড়ছে মৃতের সংখ্যা
সর্বশেষ পরিসংখ্যান দেখায়, অল্প সময়ের ব্যবধানেই মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
গত ৭ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছিল, ১৫ মার্চ থেকে তখন পর্যন্ত মোট ৮৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯৬ জন নিশ্চিত হাম আক্রান্ত এবং ৭৬৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গিয়েছিল।
বর্তমান হিসাবে মোট মৃত্যু ৯০২। অর্থাৎ ৭ আগস্টের পর থেকে আরও ৪২ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে।
এরও আগে আগস্টের শুরুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৮৪০। তখন ১৬ হাজার ১৮০ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছিল এবং আরও ১ লাখ ২৯ হাজার ৬১ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গিয়েছিল।
মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় স্পষ্ট হচ্ছে, কয়েক মাস ধরে সংক্রমণ চললেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
টিকাদান ব্যাহত হওয়া নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
হামের এই বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিশু টিকাদান ব্যবস্থায় যে ব্যাঘাত ঘটেছিল, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
দ্য ভয়েসের পর্যালোচনায় থাকা স্বাস্থ্য খাতের পটভূমি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ নির্ধারিত দেশব্যাপী হাম টিকাদান কর্মসূচি আয়োজন করতে পারেনি। এর আগের জাতীয় গণটিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল ২০২০ সালে।
এ সময় টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়ায় মজুত কমে যাওয়ার খবরও পাওয়া যায়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বিপুলসংখ্যক পদ খালি থাকায় নিয়মিত টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় এই ধরনের ব্যাঘাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ ঠেকাতে টিকাদানের হার খুবই উচ্চ পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার আওতায় ঘাটতি, টিকা কেনাকাটায় অবহেলা এবং নির্ধারিত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া—এসব বিষয় বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মজুত না থাকায় বা টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে যাওয়ায় অনেকেই শিশুদের টিকা দিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
এসব কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা আরও বেড়েছে।
দেশের অধিকাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল হাম
এপ্রিলের মধ্যেই প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তখন জানিয়েছিল, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে হামের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষ করে অল্প বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে ছিল। মৃত্যুর বড় অংশই ছিল দুই বছরের কম বয়সী শিশু, যারা টিকা নেয়নি অথবা প্রয়োজনীয় টিকার ডোজ সম্পন্ন করতে পারেনি।
বাংলাদেশে জরুরি হাম টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে এপ্রিলে কথা বলতে গিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়কারী ডা. জাহাঙ্গীর আলম টিকাদানের ঘাটতির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
তিনি বলেন, “হাম সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। টিকাদানের আওতায় সামান্য ঘাটতিও প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে। টিকার বাইরে থেকে যাওয়া প্রতিটি শিশুই ঝুঁকি বাড়ায়, অথচ এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
হামের সংক্রমণের গতি এত বেশি যে অল্পসংখ্যক টিকা না পাওয়া শিশুর একটি গোষ্ঠীও সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়।
মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৯০২ জনের মৃত্যু এবং ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে, বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখনো বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে রয়ে গেছে।

মন্তব্য