শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬ | Guadalupe |
| Guadalupe
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

শোকাবহ ১৫ আগস্ট, আজ জাতীয় শোক দিবস

অন্যান্য | ৪৯ মিনিট আগে

১৫ আগস্ট: বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত, এক অমোচনীয় অধ্যায়

- ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫২ পূর্বাহ্ন

ঢাকা, ১৫ আগস্ট ২০২৬ — বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৫ আগস্ট এমন এক তারিখ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর শোক, রাজনৈতিক অভিঘাত এবং দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক। ১৯৭৫ সালের এই দিনে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির গতিপথে এই ঘটনা সৃষ্টি করে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই ভোরের ঘটনা বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও দেশের রাজনীতি ও ইতিহাসের পরিসরে নানা ব্যাখ্যা ও বিতর্কের জন্ম দিয়ে চলেছে।

একজন জাতীয় নেতার উত্থান

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তিনি ক্রমেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ, স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক অধিকারের দাবির সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠে পরিণত হন।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর পরিস্থিতি এক निर्णায়ক মোড় নেয়। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। এর ফলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

এই রাজনৈতিক সংঘাত শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লাখো মানুষের কাছে তিনি তখন স্বাধীনতার সংগ্রাম ও নতুন রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য এক রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

একটি নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের কঠিন বাস্তবতা

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, অর্থনীতি বিপর্যস্ত, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল দুর্বল।

একদিকে সরকারকে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পুনর্গঠন করতে হচ্ছিল, অন্যদিকে একই সঙ্গে নতুন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করতে হচ্ছিল। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও সুসংহত করার কঠিন প্রক্রিয়া শুরু হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি অর্জন ছিল নতুন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

কিন্তু স্বাধীনতার পরের আশাবাদ খুব দ্রুতই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট, রাজনৈতিক সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে জনঅসন্তোষ বাড়তে থাকে এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা ও অস্থিতিশীলতাও তীব্র হয়।

১৯৭৫-এর আগে রাজনৈতিক সংকট

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় একটি মৌলিক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যান।

বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। বহুদলীয় সংসদীয় কাঠামোর পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক সংগঠনকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংবাদমাধ্যমের ওপরও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে এই পরিবর্তনগুলো।

তাঁর সমর্থকদের দৃষ্টিতে, চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট থেকে দেশকে বের করে এনে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এটি স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুত বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে সরে যাওয়ার নামান্তর।

এই অমীমাংসিত রাজনৈতিক উত্তেজনাই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের পটভূমির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

যে ভোর বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাস

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর হওয়ার আগেই একদল সেনা কর্মকর্তা ঢাকায় সামরিক অভ্যুত্থান শুরু করেন।

ধানমন্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশে অবস্থানরত তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও সেই হামলায় নিহত হন।

সেই নির্মম রাতে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব, তাঁর দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামাল, কনিষ্ঠ ছেলে শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল এবং তাঁর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের নিহত হন।

বঙ্গবন্ধুর ফোন পাওয়ার পর তাঁকে রক্ষা করতে দ্রুত তাঁর বাসভবনে ছুটে যাওয়া নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলও নিহত হন। একই ঘটনায় এসবি কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান এবং সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হকও প্রাণ হারান।

বঙ্গবন্ধুর ভাগনে ও যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসভবনেও হামলা চালানো হয়। সেখানে মণি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণিকে হত্যা করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনেও হামলা চালানো হয়। সেখানে সেরনিয়াবাত, তাঁর মেয়ে বেবী, ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, তাঁর বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং আত্মীয় রেন্টু খান নিহত হন।

বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয় এবং স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আকস্মিক ও নাটকীয় ছেদ ঘটায়।

স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মধ্যে দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতাকে হত্যার ঘটনা ছিল সদ্যোজাত রাষ্ট্রের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক বিপর্যয়।

নতুন রাজনৈতিক গতিপথ

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্রুত একের পর এক পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশ প্রবেশ করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামরিক অনিশ্চয়তার এক পর্যায়ে। পরবর্তী সময়ে একাধিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও বদলে দেয়।

জাতীয় রাজনীতিতে সামরিক প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বারবার পরিবর্তিত হতে থাকে।

ফলে ১৫ আগস্টের অভিঘাত কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই ঘটনা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

দুই কন্যার বেঁচে থাকা

১৫ আগস্টের ইতিহাসে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার বেঁচে যাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শেখ হাসিনা পরবর্তীতে বাংলাদেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ক্রমেই তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি এবং ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।

জাতীয় শোক দিবস

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়ে এসেছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করা হতো। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৫ আগস্ট নিহত তাঁর পরিবারের সদস্যদের স্মরণে নানা কর্মসূচি আয়োজন করত।

এভাবে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় বয়ানের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়।

তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পরিবর্তন আসে।

পরবর্তীতে সরকার ১৫ আগস্টের জাতীয় শোক দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও আনুষ্ঠানিক পালন বাতিল করে। এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসকে কীভাবে স্মরণ করা হবে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সূচনা করে  স্বাধীনতা বিরোধী ক্ষমতাসীন গোষ্ঠি।

ইতিহাস ও রাজনৈতিক স্মৃতি

১৫ আগস্টকে ঘিরে বিতর্ক প্রমাণ করে, বাংলাদেশের ইতিহাস এবং সমকালীন রাজনীতি কতটা গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

বঙ্গবন্ধুর সমর্থকদের কাছে তাঁর হত্যাকাণ্ড, দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার ঘটনা এবং জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়।

অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, ১৯৭৫ সালের ঘটনাকে বোঝার জন্য তার আগের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। এর মধ্যে ছিল একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর প্রবর্তন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ এবং স্বাধীনতার পর নতুন সরকারের মুখোমুখি হওয়া গভীর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট।

ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র বুঝতে এই দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অতীতকে সম্যকভাবে বুঝতে হলে স্বাধীনতা আন্দোলনে  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা যেমন স্বীকার করতে হবে, তেমনি তাঁর শাসনামলের রাজনৈতিক বিতর্ক, সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাগুলোকেও ইতিহাসের আলোকে বিচার করতে হবে।

দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে ইতিহাস

১৫ আগস্টের ইতিহাস বহুবার পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক বয়ানের মধ্য দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে।

এক পক্ষের কাছে এটি দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতার হত্যার শোকের দিন। অন্য পক্ষের কাছে এটি এমন এক জটিল রাজনৈতিক অধ্যায়, যা বুঝতে হলে হত্যাকাণ্ডের আগে সৃষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের গভীর বিশ্লেষণও জরুরি।

এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—জাতীয় ইতিহাস যেন কোনো একটি দলের রাজনৈতিক স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ে।

বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো একক রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম, প্রথম সরকারের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর—সবকিছু মিলিয়েই বাংলাদেশের জাতীয় অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস গড়ে উঠেছে।

কেন আজও গুরুত্বপূর্ণ ১৫ আগস্ট

হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও ১৫ আগস্ট গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই দিনটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রকৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে মৌলিক কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।

১৯৭৫ সালের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছিল, একটি সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সহিংসতা কীভাবে এমন পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিস্তৃত হয়।

আজকের বাংলাদেশে ১৫ আগস্টের তাৎপর্য তাই শুধু এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয় যে, দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হবে কি না।

এর চেয়েও গভীর প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ তার অতীতকে কীভাবে স্মরণ করবে এবং কীভাবে সেই অতীতকে বুঝবে।

ইতিহাসকে মুছে নয়, সত্যকে ধারণ করে

রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় শোক দিবসের পালন বাতিল করা ১৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ঘটনাকে মুছে দেয় না। একইভাবে, কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি পালন করাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও বিতর্ককে শেষ করে দিতে পারেনি।

ঐতিহাসিক স্মৃতি কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

১৯৭৫ সালের ঘটনাগুলো ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেগুলো নিয়ে গবেষণা করবে, বিতর্ক করবে এবং নতুন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করবে।

একটি পরিণত গণতন্ত্রের দায়িত্ব অতীতের একটিমাত্র ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং ইতিহাসের দলিল সংরক্ষণ করা এবং মানুষকে সেই ইতিহাস সততা, যুক্তি ও নির্ভয়ের সঙ্গে পর্যালোচনা করার সুযোগ দেওয়া।

বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নির্ধারক অধ্যায়

বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিঃসন্দেহে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন। স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্ব তাঁকে রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছে। একই সঙ্গে তাঁর শাসনামলের বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতাও বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ আমূল পরিবর্তন করে দেয়।

এই কারণে ১৫ আগস্ট কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুর তারিখ নয়। এটি একটি তরুণ প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে এক গভীর রাজনৈতিক ছেদ, যার পর শুরু হওয়া ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী বহু দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও বাংলাদেশের সামনে রয়েছে একটি কঠিন প্রশ্ন—কীভাবে ঐতিহাসিক স্মৃতিকে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়।

সবচেয়ে গঠনমূলক পথ সম্ভবত ১৫ আগস্টকে জাতীয় স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা নয়, আবার এর অর্থকে একটি মাত্র রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যেও আটকে রাখা নয়। বরং প্রয়োজন ঐতিহাসিক দলিল ও স্মৃতি সংরক্ষণ করা, রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহতা স্বীকার করা এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের প্রথম অধ্যায়ের সাফল্য, ব্যর্থতা, অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও বৈপরীত্যকে বুদ্ধিবৃত্তিক সততার সঙ্গে পর্যালোচনা করা।

সেই অর্থে, ১৫ আগস্ট শুধু স্মরণের একটি তারিখ নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুরতা, অসহিষ্ণুতার পরিণতি এবং সাংবিধানিক গণতন্ত্রের স্থায়ী গুরুত্বের এক গভীর ঐতিহাসিক শিক্ষা।

মন্তব্য

Scroll to Top