শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ | Boston |
| Boston
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

‘নিখোঁজ’ ফটোসাংবাদিক বাদল কারাগারে, আটকের তথ্য গোপন করেছিল পুলিশ

- ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৭ অপরাহ্ন

‘নিখোঁজ’ হিসেবে খোঁজ চলা ফটোসাংবাদিক বাদল দাসকে শেষ পর্যন্ত কারাগারে পাওয়া গেছে। পুলিশ প্রথমে তাকে আটকের তথ্য স্বীকার না করলেও পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) জানিয়েছে, তাদের সদস্যরাই তাকে আটক করেছিলেন এবং পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

বাদল দাস নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার, সহকর্মী ও পরিচিতজনেরা যখন তাকে খুঁজছিলেন, তখন তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতেই ছিলেন—ডিবির পরবর্তী বক্তব্যে এমন তথ্যই সামনে এসেছে। ফলে তাকে আটকের পর সেই তথ্য কেন গোপন রাখা হয়েছিল এবং তার অবস্থান জানতে চেয়েও সহকর্মীরা কেন পুলিশের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাননি, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

দৈনিক নবচেতনার ফটোসাংবাদিক বাদল দাস (৫০) সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার বন্ধু ও রুমমেট ফটোসাংবাদিক সুজিত শেখ বাবু পল্টন মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

বাদল নিখোঁজ হওয়ার পর তার মোবাইল ফোনটি কক্ষে পাওয়া যায়। পরে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে বাবুকে ফোন করে জানানো হয়, বাদল ডিবির হেফাজতে রয়েছেন।

এরপর বাবু মতিঝিল থানা ও ডিবি কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করে বাদলের সন্ধান জানতে চান। কিন্তু পুলিশ তখন বাদলকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করেনি। ডিবি কার্যালয়েও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। যে নম্বর থেকে ফোন করে বাদলের ডিবি হেফাজতে থাকার কথা জানানো হয়েছিল, পরে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়।

এর মধ্যে পল্টন মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম নিশ্চিত করেন, বাদল দাস নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে এবং পুলিশ তার সন্ধানে কাজ করছে।

কিন্তু ডিবির পরবর্তী বক্তব্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে বাদল পুলিশ হেফাজতে ছিলেন।

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিএমপির ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম স্বীকার করেন, মঙ্গলবার মতিঝিল এলাকা থেকে বাদল দাসসহ ছয়-সাতজনকে আটক করেছিলেন ডিবি সদস্যরা।

পুলিশের দাবি, বাদল ও অন্যদের গাঁজাসহ আটক করা হয়েছিল। পরে তাদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

বাদলের কাছ থেকে গাঁজা উদ্ধারের বিষয়টি পুলিশের ভাষ্য। বাদল গাঁজা সেবন করতেন, এমন তথ্য তার সহকর্মী ও ঘনিষ্টজনরা কেউ জানেন না। তাঁকে কখনই গাঁজা সেবন করতে বা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে দেখা যায়নি।

ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, ডিবি বাদলকে আটকের পরও একটি সময় পর্যন্ত তার পরিবার, সহকর্মী ও রুমমেট তার অবস্থান জানতে পারেননি। এমনকি ডিবি হেফাজতে থাকার তথ্য পাওয়ার পর সুনির্দিষ্টভাবে পুলিশ ও ডিবির সঙ্গে যোগাযোগ করেও তারা তার অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেননি।

এই ঘটনাপ্রবাহ গুমের অভিযোগকে সামনে এনেছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থার হাতে কোনো ব্যক্তিকে আটক করার পর সেই আটকের কথা অস্বীকার বা গোপন করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে তথ্য না দেওয়াকে আন্তর্জাতিক আইনে গুম বা বলপূর্বক অন্তর্ধানের সংজ্ঞার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাদল দাসের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ডিবি তার আটকের কথা স্বীকার করেছে এবং তিনি কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে তার অজ্ঞাত অবস্থানের অবসান ঘটেছে। তবে আটকের পর একটি সময় পর্যন্ত তার অবস্থান গোপন থাকা এবং পুলিশ সেই আটকের কথা স্বীকার না করার অভিযোগ থেকেই যাচ্ছে।

বিশেষ করে, বাদল নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর তার সহকর্মীরা যখন বিভিন্ন জায়গায় তাকে খুঁজছিলেন, তখন পুলিশেরই একটি অংশ তার সন্ধানে কাজ করার কথা জানিয়েছিল। অথচ পরে ডিবি স্বীকার করেছে, তাদের সদস্যরাই তাকে আটক করেছিলেন।

বাদলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পরই তার ডিবির হাতে আটকের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে। ফলে আটকের তথ্য আগে কেন প্রকাশ করা হয়নি এবং তার সন্ধানে থাকা স্বজন ও সহকর্মীদের কেন তা জানানো হয়নি—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি নিয়ে আরও প্রশ্ন রয়েছে—ঠিক কখন বাদলকে আটক করা হয়েছিল, আটকের পর তাকে কোথায় রাখা হয়েছিল, কখন তার পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল এবং কোন আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

বাদল দাস পটুয়াখালী সদরের বাসুদেব দাসের ছেলে। ঢাকায় তিনি গুলিস্তানের শিশু কল্যাণ পরিষদ ভবনে থাকতেন।

শেষ পর্যন্ত বাদল দাসের অবস্থান জানা গেছে। তিনি এখন আর ‘নিখোঁজ’ নন। কিন্তু ডিবির স্বীকারোক্তির পর মূল প্রশ্নটি এখন অন্য জায়গায়—রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হেফাজতে থাকা একজন ফটোসাংবাদিককে যখন তার পরিবার ও সহকর্মীরা খুঁজছিলেন, তখন তাকে আটকের তথ্য কেন গোপন রাখা হয়েছিল? তাছাড়া একজন সাংবাদিককে এভাবে গাঁজার মামলায় আটক দেখানো সাংবাদিকতাকে আতংকে রাখার কৌশল বলে সহকর্মীরা মনে করছে।

মন্তব্য

Scroll to Top