কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মাদ্রাসার একাধিক ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে এক শিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। অভিযোগ জানাজানি হওয়ার পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ওই শিক্ষককে মারধর করেন। তাঁকে উদ্ধার করতে গিয়ে জনতার হামলায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ সময় পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানও ভাঙচুর করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুরে দৌলতপুর উপজেলার খলিশাকুন্ডি ইউনিয়নের মালিথাপাড়া গ্রামের মারকাজুল মাদ্রাসায় এ ঘটনা ঘটে।
আটক শিক্ষকের নাম আশিকুল্লাহ (৪০)। তিনি মাদ্রাসাটির হেফজ বিভাগের শিক্ষক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জামদিয়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের প্রয়াত কারি এনায়কুল্লাহর ছেলে।
আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) নজরুল ইসলাম ও কনস্টেবল আজম হোসেন। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের কয়েকজন ছাত্রকে বিভিন্ন সময়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে শিক্ষক আশিকুল্লাহর বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীরা বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানালে ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রকে কোরআন পড়ানোর কথা বলে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নির্যাতন করেন ওই শিক্ষক। বিষয়টি কাউকে জানালে ক্ষতি করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে শিশুটি।
একপর্যায়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করা শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনা খুলে বলে। এরপর স্বজনেরা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে একাধিক ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের স্বজনসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ মাদ্রাসার সামনে জড়ো হন।
একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ লোকজন মাদ্রাসাটি ঘেরাও করে শিক্ষক আশিকুল্লাহকে আটকে রাখেন। এ সময় তাঁকে মারধর করা হয় বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা থেকে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে অভিযুক্ত শিক্ষককে উদ্ধার করে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করে।
তবে শিক্ষককে পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার সময় উত্তেজিত জনতার একাংশ পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এ সময় পুলিশের পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করা হয়।
হামলায় দৌলতপুর থানার ওসি খালেদুর রহমান, এএসআই নজরুল ইসলাম ও কনস্টেবল আজম হোসেন আহত হন।
পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে অভিযুক্ত শিক্ষককে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
নির্যাতনের অভিযোগ শিক্ষার্থীদের
যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করা এক শিক্ষার্থী জানায়, মাদ্রাসার ওই শিক্ষক তাকে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন করেছেন।
শিক্ষার্থীটি বলে, ‘মাদ্রাসার শিক্ষক আমাকে বিভিন্ন সময় নির্যাতন করেছেন। আর সহ্য করতে না পেরে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানাই। পরে তাঁরা মাদ্রাসায় এসে তাঁকে আটকে রাখেন।’
অন্য এক শিক্ষার্থীর স্বজন জানান, তাঁর সন্তানের প্রয়াত মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলে কোরআনের হাফেজ হবে। সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই ছেলেকে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে তার মৃত মায়ের ইচ্ছা পূরণের জন্য মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলাম, যেন সে কোরআনের হাফেজ হতে পারে। অথচ আমার ছেলেই এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।’
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
অভিযুক্ত শিক্ষককে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা
খলিশাকুন্ডি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান, মাদ্রাসার একাধিক ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষককে আটকে রাখেন।
তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রকে নির্যাতনের অভিযোগে স্থানীয় লোকজন ওই শিক্ষককে আটকে রাখেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।’
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
তিনি বলেন, ‘অভিযুক্ত শিক্ষককে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে থানায় নেওয়ার সময় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে আমিসহ তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছি।’
ওসি জানান, অভিযুক্ত শিক্ষককে থানায় নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আহত তিন পুলিশ সদস্যকে চিকিৎসা
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক তৌহিদুল হাসান তুহিন জানিয়েছেন, আহত পুলিশ সদস্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, মাদ্রাসার একাধিক ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে উদ্ধারের সময় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা বা অভিযোগ গঠনের তথ্য পাওয়া যায়নি। যৌন নির্যাতনের অভিযোগগুলোর সত্যতা ও পরিধি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
ভুক্তভোগী শিশুদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা হয়েছে।

মন্তব্য