ঢাকা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এর এজলাসে বৃহস্পতিবার এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাজির করা হয়েছিল সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে। শুনানি শেষে বিচারকাজ প্রায় শেষ হওয়ার পর আদালতের উদ্দেশে কথা বলার চেষ্টা করেন তিনি। তবে আদালত তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দিলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আদালতকে বলতে চেয়েছিলাম, ফাঁসি দিয়ে দিন। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু আদালত শুনতে চাইল না।”
বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এ এ ঘটনা ঘটে। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপরই তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।
আদালতকক্ষ সূত্রে জানা যায়, হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে তিনি কয়েকবার কথা বলার অনুমতি চান। বিচারকরা তখন এজলাস ত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আদালত তার বক্তব্য শোনেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, “হায়রে হাই, এই যদি হয় আদালতের অবস্থা, তাহলে যাব কোথায়?” একই সঙ্গে তিনি নিজের ফাঁসির দাবিও জানান।
এরপর আদালতকক্ষেই দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে হাতকড়া পরিয়ে ট্রাইব্যুনাল থেকে বের করে নিয়ে যায় এবং পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়।
শাপলা চত্বর মামলায় ১০ নম্বর আসামি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম জানান, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত সোমবার ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনাল এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে এবং বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী এ মামলার ১০ নম্বর আসামি। ২০১৩ সালে তিনি তৎকালীন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং শাপলা চত্বরে পরিচালিত অভিযানের পরিকল্পনায় তার সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে কী অভিযোগ
মামলাটি ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ওই অভিযানে এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহে বহু মানুষ নিহত হন। তদন্ত শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা অভিযোগপত্রে ঘটনাটিকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত সংস্থার দাবি, অভিযানে নিহতের সংখ্যা ৫৮ জন। তবে ২০১৩ সালের ওই ঘটনার প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন হওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
আদালতে উপস্থিত ছিলেন কাদের সিদ্দিকী
শুনানির সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ছোট ভাই, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে তিনি দাবি করেন, তার বড় ভাইকে অন্যায়ভাবে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।
কাদের সিদ্দিকী বলেন, “আমার বড় ভাইকে অন্যায়ভাবে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে। আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।”
তিনি বলেন, আদালতের প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন।
তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইতোমধ্যে মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করেছে। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং আটক আসামিদের আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছে। তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং অন্যান্য বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি পূর্ণাঙ্গ বিচারের দিকে এগিয়ে যাবে।


