শুভ জন্মদিন, শেখ হাসিনা।
শুভ জন্মদিন, আস্থার নেত্রী।
আপনি আজ বাংলাদেশের বাইরে, ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু দেশের কোটি কোটি মানুষের কছে আপনি উজ্জ্বল। দেশের রাজনীতি থেকে আপনার নাম, আপনার প্রভাব এবং আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও একটুও মুছে যায়নি। বরং আপনার অনুপস্থিতিই যেন বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আপনার সমর্থকদের কাছে আজও আপনি সেই নেতা, যাঁর ওপর কঠিন সময়ে আস্থা রাখা যায়, যিনি সংকটের মুখে পিছিয়ে যান না।
আজকের এই জন্মদিনে তাই ফিরে তাকাতে হয় ৪৫ বছর আগের সেই দিনে।
১৯৮১ সালের ১৭ মে। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে শেখ হাসিনা ফিরে এসেছিলেন তাঁর প্রিয় বাংলাদেশে। তখনও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার ক্ষত শুকায়নি। ব্যক্তিগত শোক তখনও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। কিন্তু সেই শোককে সঙ্গে নিয়েই তিনি ফিরেছিলেন রাজনীতির কঠিন পথে।
নিউ দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে জড়ো হয়েছিল মানুষের বিশাল সমাবেশ। তিনি ফিরেছিলেন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে এবং আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেওয়া একজন সংগ্রামী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে।
সেই প্রত্যাবর্তনই পরবর্তী চার দশকের রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা করে।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন কখনোই মসৃণ ছিল না। বারবার রাজনৈতিক সংকট, তীব্র বিরোধিতা, আন্দোলন এবং তাঁর জীবনের ওপর একাধিক হামলার হুমকির মধ্যেও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে থেকেছেন। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নের ওপরও গভীর ছাপ রেখে গেছেন।
তাঁর শাসনামলের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক দিয়ে অস্বীকার করা কঠিন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মন্দার আগে এক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। দীর্ঘ সময়ে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, বিদ্যুৎ সুবিধার বিস্তার ঘটেছে এবং তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।
পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সেই উন্নয়নযাত্রার দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অর্জন একদিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানব উন্নয়নের ধারাবাহিক অগ্রগতি।
তবে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ আবারও কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি।
বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনও ৮ দশমিক ৫ শতাংশের মতো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা আনুমানিক ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে। ব্যাংকিং খাতেও সংকট গভীর হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটকে শুধু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি চাপ মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর একটি জটিল চাপ তৈরি হয়েছে।
তারপরও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিস্থাপকতার লক্ষণ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে প্রায় ২৯ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার ছিল। প্রবাসী আয়ও বৈদেশিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এখনও সক্রিয় রয়েছে।
এই বাংলাদেশকেই এখন ভারত থেকে দেখছেন শেখ হাসিনা।
২০২৪ সালে তাঁর সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। কিন্তু দেশ থেকে দূরে থাকলেও তাঁর রাজনৈতিক উপস্থিতি শেষ হয়নি। বরং তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে। শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।
ফলে তাঁর ভারতে অবস্থান এখন আর শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নির্বাসনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্কও জড়িয়ে গেছে।
ভারত থেকে শেখ হাসিনার প্রতিটি বক্তব্য তাই ঢাকায় রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর একটি বক্তব্য যেমন তাঁর সমর্থকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করে, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনাকে কি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে আলাদা করা সম্ভব?
তাঁর সমর্থকদের উত্তর স্পষ্ট।
তাঁরা মনে করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এমন এক সময় পার করেছে, যখন বিদ্যুৎ সংকট থেকে বিদ্যুৎ সুবিধার বিস্তার, অবকাঠামোগত পশ্চাৎপদতা থেকে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা থেকে বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।
তাঁদের কাছে পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়। এটি আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। মেট্রোরেল শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়। এটি বদলে যাওয়া ঢাকার প্রতিচ্ছবি। রূপপুর শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়। এটি বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতীক।
অন্যদিকে তাঁর সমালোচকরাও রয়েছেন। তাঁরা দীর্ঘ শাসনামলে নির্বাচন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। এসব প্রশ্নও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ এবং সেগুলোকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো নেতাকে শুধু প্রশংসা বা সমালোচনার একটিমাত্র আয়নায় দেখে না। ইতিহাস বিচার করে একটি দীর্ঘ সময়কে, তার অর্জন ও ব্যর্থতাকে, তার উন্নয়ন ও সংকটকে, তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং তার পরিণতিকে একসঙ্গে বিবেচনা করে।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না।
তবে তাঁর সমর্থকদের কাছে আজকের দিনটি ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের দিন নয়। এটি আবেগের দিন। স্মৃতির দিন। একজন নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামকে স্মরণ করার দিন।
১৯৮১ সালে যে নারী ব্যক্তিগত জীবনের ভয়াবহতম শোককে পেছনে ফেলে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন, তিনি পরবর্তী চার দশক দেশের রাজনীতির কেন্দ্রেই ছিলেন। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেছেন, বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন, সাফল্য পেয়েছেন, কঠিন সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর উপস্থিতি কখনোই উপেক্ষা করা যায়নি।
আজ বাংলাদেশ আবার একটি অনিশ্চিত রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
অর্থনীতির সামনে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ। রাজনীতির সামনে রয়েছে আস্থা, স্থিতিশীলতা ও সমঝোতার প্রশ্ন। আর পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।
এই পরিবর্তনশীল বাংলাদেশে শেখ হাসিনা শারীরিকভাবে অনুপস্থিত হলেও রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত নন।
তাঁর জন্মদিন তাই তাঁর সমর্থকদের কাছে শুধু একটি জন্মদিন নয়। এটি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাকে স্মরণ করার উপলক্ষ। সেই যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি দিয়ে, এগিয়েছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।
শুভ জন্মদিন, শেখ হাসিনা।
শুভ জন্মদিন, আস্থার নেত্রী।
আপনি আজ বাংলাদেশের মাটিতে নেই। কিন্তু আপনার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ ছায়া এখনও বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং জনজীবনের ওপর দৃশ্যমান। আপনার সমর্থকদের কাছে সেই স্মৃতি এখনও জীবন্ত, সেই আস্থা এখনও অটুট।
আর সেই কারণেই আপনার জন্মদিনে তাঁদের একটাই প্রত্যাশা, একদিন আবার আপনি ফিরে আসবেন আপনার প্রিয় বাংলাদেশে।

মন্তব্য