শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে

- ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৪ অপরাহ্ন

ঢাকা, ২০ আগস্ট – প্রবীন রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘপথ পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছুলেন ‍। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া ফখরুলের রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল রাজনীতির বাইরে নয়, বরং শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির মধ্য দিয়ে।  সময়ের সঙ্গে তিনি জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে।

শিকড় ঠাকুরগাঁওয়ে, পরিবারেও রাজনীতির উত্তরাধিকার

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন রাজাকারের তালিকায় মুসলিম লীগের প্রখ্যাত নেতা। চখা মিয়া নামেরই তাঁর প্রসিদ্ধি। ১৯৭০ সালের জাতীয়  নির্বাচনে দিনাজপুর -২ আসনে  তিনি তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহম্মদ আজিজুর রহমানের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন।  তবে, জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে  সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই পারিবারিক পরিবেশ তাঁর রাজনৈতিক মানস গঠনে প্রভাব ফেললেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের  নিজস্ব পথচলা ছিল দীর্ঘ এবং বহুমাত্রিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি, ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়তা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
এই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও সংগঠক হিসেবে পরবর্তী বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু

শিক্ষাজীবন শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।

সরকারি চাকরির পাশাপাশি তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বেও কাজ করেন। বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে দায়িত্ব পালনের তথ্যও সরকারি জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৭৯ সালের শেষ দিকে তিনি তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৮২ সালে এস. এ. বারীর পদত্যাগের পর ফখরুল আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান।

সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে

১৯৮৬ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতির দিকে এগিয়ে যান। ১৯৮৮ সালে তিনি নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর পরের কয়েক বছরেই তাঁর রাজনৈতিক পথ বিএনপির সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়।

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সদালাপী  ্তএ্নই নেতা  বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। ধীরে ধীরে তিনি জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে উঠে আসেন।

সংসদ ও মন্ত্রিসভায় প্রবেশ

১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি জয়ী হতে পারেননি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই আসন থেকে নির্বাচিত হন।
বিএনপি সরকারের সময়ে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উত্থান

দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের  উত্থান ছিল ধীর কিন্তু ধারাবাহিক। ২০০৯ সালে তাঁকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। ২০১১ সালে দলের তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

দীর্ঘ সময় তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে দলীয় অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং বিরোধী রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বঙ্গভবনে

২০২৬ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়। সংসদে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা শুরু থেকেই প্রবল ছিল। শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর অভিষেক তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিণতি। একজন শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দলের মহাসচিব—এই ধারাবাহিকতার পর তিনি এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সাংবিধানিক দায়িত্বে।

ব্যক্তিজীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমকে বিয়ে করেছেন। তাঁদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।

তাঁর বড় মেয়ে শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ায় গবেষণার কাজে যুক্ত হন। ছোট মেয়ে সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং শিক্ষকতা করেন বলে প্রকাশিত জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।

এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার নতুন অধ্যায়

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনকে শুধু একজন দলীয় রাজনীতিকের উত্থান হিসেবে দেখলে তাঁর পথচলার পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। শিক্ষকতা থেকে প্রশাসন, পৌর রাজনীতি থেকে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা থেকে বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পদ—তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পর্যায়ই বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।

২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ যাত্রা এখন নতুন সাংবিধানিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে দলীয় রাজনীতির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সব নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রপ্রধানের নিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করা।

মন্তব্য

Scroll to Top