ঢাকা, ২০ আগস্ট — ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৬৯০ বন্দি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি—কারা মহাপরিদর্শকের এমন তথ্য প্রকাশের একদিন পরই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহের হোসেনকে আইজি প্রিজন্সের পদ থেকে প্রত্যাহার করেছে সরকার। তাকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে ন্যস্ত করা হয়েছে।
বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। উপসচিব মোহাম্মদ নূর-আলম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোতাহের হোসেন, এনডিসি, পিএসসি-কে বর্তমান প্রেষণ পদ থেকে প্রত্যাহার করে তার চাকরিসংশ্লিষ্ট বিভাগে ন্যস্ত করা হয়েছে। তার নতুন কর্মস্থল সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ।
জনস্বার্থে জারি করা আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কেন তাকে প্রত্যাহার করা হলো, সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
ফলে সময়ের এই ঘনিষ্ঠতা নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। মঙ্গলবার কারা মহাপরিদর্শক যখন দুই হাজার ২০০-এর বেশি বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা এবং এখনও ৬৯০ বন্দি ও দুই জঙ্গি পলাতক থাকার তথ্য প্রকাশ করলেন, তার পরদিনই তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা অবশ্য এখনো সরকারি ভাবে বলা হয়নি।
প্রত্যাহারের একদিন আগে কী জানিয়েছিলেন আইজি প্রিজন্স?
মঙ্গলবার ঢাকায় কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোতাহের হোসেন জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার সময় দেশের বিভিন্ন কারাগারে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুযোগে দুই হাজার ২০০ জনের বেশি বন্দি পালিয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে তাদের বড় একটি অংশকে গ্রেপ্তার করা হয় অথবা তারা আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এখনও ৬৯০ জন পলাতক।
আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল—পলাতকদের মধ্যে দুজন জঙ্গিও এখনো অধরা।
দুই বছর পরও বিপুলসংখ্যক বন্দি, বিশেষ করে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিদের সন্ধান না পাওয়া দেশের কারা নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।
কারাগারে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বিপর্যয়
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতার সময় দেশের কারাব্যবস্থায় বড় ধরনের নিরাপত্তা বিপর্যয় ঘটে।
কারা কর্তৃপক্ষের আগের হিসাব অনুযায়ী, অন্তত আটটি কারাগারে হামলা হয় এবং পাঁচটি কারাগার থেকে বন্দিরা পালিয়ে যায়।
নরসিংদী জেলা কারাগার ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি। ১৯ জুলাই হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর সেখান থেকে ৮২৬ বন্দি পালিয়ে যায়। পরে তাদের ৬৯০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় অথবা তারা আত্মসমর্পণ করে।
কাশিমপুর, শেরপুর ও সাতক্ষীরাসহ আরও কয়েকটি কারাগারেও হামলা, অগ্নিসংযোগ ও বন্দি পালানোর ঘটনা ঘটে।
কিছু ঘটনায় কারাগার থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনাও ঘটেছিল বলে আগের তথ্য থেকে জানা যায়।
ছয় মাসে কমেছে পলাতকের সংখ্যা, কিন্তু রয়ে গেছে বড় ঘাটতি
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তখন ৯০১ বন্দি পলাতক ছিল। তাদের মধ্যে ৯৮ জন ছিল জঙ্গি; ৭০ জন সাজাপ্রাপ্ত এবং ২৭ জন জঙ্গি তখনও নিখোঁজ ছিল।
ডিসেম্বর নাগাদ দুই হাজার ২০০-এর বেশি পলাতক বন্দির মধ্যে প্রায় এক হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়। তখনও প্রায় ৭০০ বন্দি অধরা ছিল।
বর্তমানে সংখ্যাটি ৬৯০-এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কারা কর্তৃপক্ষের অভিযানে কিছু অগ্রগতি হলেও দুই বছর পরও শত শত বন্দির সন্ধান না পাওয়া একটি গুরুতর নিরাপত্তা প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।
এর মধ্যেই আল-কায়েদা নিয়ে জাতিসংঘের নতুন উদ্বেগ
কারাগার থেকে পলাতক ৬৯০ বন্দির বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উদ্বেগ একই সময়ে সামনে এসেছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের Analytical Support and Sanctions Monitoring Team (ASMT)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)-এর বাংলাদেশে সক্রিয় সেল বা নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি ১০ আগস্ট প্রকাশিত হয় এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছে।
জাতিসংঘের এই Monitoring Team নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট স্যাংশনস কমিটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন, তাদের নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট হুমকি সম্পর্কে বিশ্লেষণ সরবরাহ করে। বর্তমানে দলটিতে ১০ জন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।
সরকারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বনাম দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
জাতিসংঘের মূল্যায়ন সামনে আসার পর সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সংশয় প্রকাশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিবেদনটির সংশ্লিষ্ট উদ্বেগকে অনুমাননির্ভর বলে প্রত্যাখ্যান করা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বিস্তারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশিত হলে সরকারের পক্ষে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়।
কিন্তু এখানেই বিষয়টির আরও গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর একটি স্তর রয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মূল্যায়নকে রাজনৈতিক চাপ, অনুমান বা অপপ্রচার হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা যেমন সরকারের অধিকার, তেমনি সেই মূল্যায়নের পেছনে যে তথ্য, গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ রয়েছে, সেগুলোও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কারণ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ও বিস্ফোরণের চেষ্টা, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার, সন্দেহভাজন জঙ্গি ও উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের তৎপরতা এবং বিভিন্ন অভিযানে বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ উদ্ধারের ঘটনা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন করে সতর্কতার কারণ তৈরি করেছে।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি।
দুটি আলাদা ঘটনা, কিন্তু একই নিরাপত্তা প্রশ্ন
আইজি প্রিজন্সের প্রত্যাহার এবং জাতিসংঘের AQIS-সংক্রান্ত উদ্বেগ—দুটি ঘটনা সরাসরি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, এমন কোনো প্রমাণ এখনো নেই।
কিন্তু একই সময়ে দুটি বিষয় সামনে আসায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
একদিকে দুই বছর পরও ৬৯০ পলাতক বন্দি; অন্যদিকে একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার বাংলাদেশে AQIS-এর নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ।
দুটিই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সক্ষমতা, তথ্যের স্বচ্ছতা, গোয়েন্দা সমন্বয় এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
আইজি প্রিজন্স প্রত্যাহার: এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
সরকারি প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের কারণ না থাকায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোতাহের হোসেনের অপসারণ নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই সম্ভব নয়।
কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের সময়কাল প্রশ্নটিকে অনিবার্য করে তুলেছে।
মঙ্গলবার তিনি প্রকাশ্যে জানালেন—৬৯০ বন্দি এখনও পলাতক এবং তাদের মধ্যে দুজন জঙ্গি। বুধবার সরকার তাকে আইজি প্রিজন্সের পদ থেকে প্রত্যাহার করল।
সরকার যদি এর পেছনে প্রশাসনিক, সাংগঠনিক বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানায়, তাহলে বিতর্কের একটি বড় অংশের অবসান হতে পারে।
কারণ বিষয়টি শেষ পর্যন্ত একজন কর্মকর্তার পদায়ন বা প্রত্যাহারের চেয়েও বড়।
এটি বাংলাদেশের কারা নিরাপত্তা, পলাতক অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের সক্ষমতা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মূল্যায়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক—সবকিছুকে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।
আর তাই এখন মূল প্রশ্ন শুধু “আইজি প্রিজন্সকে কেন সরানো হলো?” নয়। তার সঙ্গে আরও বড় প্রশ্নটি হলো—দুই বছর পরও ৬৯০ বন্দি কোথায়, তাদের মধ্যে দুজন জঙ্গি কীভাবে এখনো অধরা, এবং রাষ্ট্র এই দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা ঘাটতি মোকাবিলায় আসলে কতটা প্রস্তুত?

মন্তব্য