ঢাকা: দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৪০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুধবার প্রকাশিত হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সর্বশেষ তিন শিশুর মধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুরে একজন করে মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ৯৬ শিশু। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪০। ইউনিসেফের অনুরোধ সত্ত্বেও মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তবর্তী সরকার আমলে শিশুদের টিকাদান বন্ধ করে দেওয়ায় এবং বর্তমান সরকার আমলে চিকৎসা ব্যবস্থায় মারাত্মক ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনা তৈরি হওয়ায় হামে আক্রান্ত হয়ে শত শত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
সর্বশেষ প্রতিবেদনের সময়কালে নতুন করে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৮৭২ শিশু। এর মধ্যে ১২১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ৭৫১ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে।
আক্রান্ত প্রায় দেড় লাখ শিশু
গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর মোট সংখ্যা এক লাখ ৪৫ হাজার ২৪১।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ সময় এক লাখ ২৯ হাজার ৬১ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। পরীক্ষা করে হাম নিশ্চিত হয়েছে ১৬ হাজার ১৮০ শিশুর।
আক্রান্তদের একটি বড় অংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে এক লাখ ১১ হাজার ৬৭৪ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে এক লাখ ৭ হাজার ৩৯৭ জন।
এই বিপুলসংখ্যক শিশুর হাসপাতালে ভর্তির তথ্য চলমান প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতা এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
দেশের অধিকাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে হাম
বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে চলতি বছরের এপ্রিলেই সতর্ক করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার পর গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (IHR) ফোকাল পয়েন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটিকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে অন্তত ৫৮ জেলায় হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। তখন থেকেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিল অল্প বয়সী শিশুরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, তখন আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশের বয়স ছিল পাঁচ বছরের কম এবং ৬৬ শতাংশের বয়স দুই বছরের নিচে। নিহতদের একটি বড় অংশও ছিল দুই বছরের কম বয়সী টিকা না পাওয়া শিশু।
এরপর কয়েক মাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আরও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
টিকা না পাওয়া শিশুদের ঝুঁকি বেশি
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও টিকার মাধ্যমে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ উভয় সংস্থাই হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে শিশুদের টিকাদানের ঘাটতিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়ক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বাংলাদেশে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলেন, “হাম সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। টিকাদানের আওতায় সামান্য ঘাটতিও প্রাদুর্ভাব ঘটাতে পারে। টিকা থেকে বাদ পড়া প্রতিটি শিশু ঝুঁকি বাড়ায়, অথচ এটি এমন একটি রোগ যা আমরা প্রতিরোধ করতে পারি।”
ইউনিসেফের মতে, হামের সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদে ঠেকাতে জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ হামের টিকা দেওয়া প্রয়োজন।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে, নিয়মিত টিকাদানে ধারাবাহিক ঘাটতি তৈরি হলে একটি জনগোষ্ঠীতে বিপুলসংখ্যক অরক্ষিত শিশু থেকে যায়। ফলে অত্যন্ত সংক্রামক হামের ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে।
আক্রান্তদের ৭২ শতাংশই টিকা পায়নি
চলতি বছরের এপ্রিলে ইউনিসেফের প্রকাশিত পরিস্থিতি প্রতিবেদনে টিকাদানের ঘাটতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের প্রথম পর্যায়ে আক্রান্ত শিশুদের ৭২ শতাংশ হামের কোনো টিকাই পায়নি। আরও ১৬ শতাংশ শিশু আংশিকভাবে টিকা পেয়েছিল।
সে সময় আক্রান্তদের ৮১ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
এই পরিসংখ্যান থেকে টিকাদানের আওতার সঙ্গে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উঠে এসেছে। বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।
সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গ্যাভি—দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের সহযোগিতায় সরকার গত এপ্রিল থেকে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে।
গত ৫ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৮ জেলার উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ৩০ উপজেলায় এই কর্মসূচি শুরু হয়। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১২ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
হামের সংক্রমণ ঠেকাতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরেও বড় পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে টিকাদান শুরু হওয়ার পর মে মাসের মধ্যে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক লাখ ৬৬ হাজারের বেশি শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়।
সেখানে লক্ষ্যমাত্রার ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল।
মার্চ থেকে দ্রুত বেড়েছে সংক্রমণ
প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তুলনা করলে সংক্রমণের ভয়াবহ বিস্তার স্পষ্ট হয়।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ৯ হাজার ৮৮৩টি সন্দেহভাজন এবং এক হাজার ৩৯৮টি পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন হামে ১২৮ এবং নিশ্চিত হামে ২১ জনের মৃত্যুর তথ্য ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ১৪ এপ্রিলের মধ্যে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১৯ হাজার ১৬১ এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী ছিল দুই হাজার ৯৭৩ জন। তখন হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ এবং নিশ্চিত হামে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
সে সময়ের মধ্যেই দেশের আটটি বিভাগের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত ও উপসর্গসহ আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়ে এক লাখ ৪৫ হাজার ২৪১ এবং মৃতের সংখ্যা ৮৪০-এ পৌঁছেছে।
প্রতিরোধযোগ্য রোগ, তবু প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরা
হাম বাতাসের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নেওয়া, কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে দিতে পারে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি।
বেশির ভাগ শিশু চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠলেও অল্প বয়সী, অপুষ্টিতে আক্রান্ত এবং টিকা না পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
নিউমোনিয়া, গুরুতর ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কের প্রদাহসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।
বাংলাদেশে চলমান প্রাদুর্ভাবেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অল্প বয়সী শিশুরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্যেই দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক বলে উঠে এসেছিল।
মার্চের মাঝামাঝি থেকে ইতোমধ্যে ৮৪০ শিশুর মৃত্যু এবং এক লাখের বেশি শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চলার পরও নতুন করে শিশু আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ফলে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো, নিয়মিত টিকাদান থেকে বাদ পড়া প্রতিটি শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনা এবং গুরুতর অসুস্থ শিশুদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


