বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘ব্লাসফেমি’ অভিযোগের অপব্যবহারের অভিযোগ

এইচআরসিবিএমের দাবি, ছয় মাসে ১৭টি ঘটনা নথিভুক্ত; তাহিরপুরের দীপ্ত রায়ের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘ব্লাসফেমি’ বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে পরিকল্পিতভাবে হয়রানি ও নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংখ্যালঘু অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (এইচআরসিবিএম)। সংস্থাটির দাবি, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ ধরনের অন্তত ১৭টি ঘটনার তথ্য তারা নথিভুক্ত করেছে।

শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই সংস্থাটি বলেছে, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার হিন্দু যুবক দীপ্ত রায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ধর্ম অবমাননার অভিযোগ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতাকে আবারও সামনে এনেছে।

সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় একটি নির্দিষ্ট ধারা বারবার দেখা যাচ্ছে—প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে, এরপর জনতা জড়ো হয়, পুলিশ দ্রুত অভিযুক্তকে আটক করে, আর ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্তের পরিবার, বাড়িঘর, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, এমনকি উপাসনালয়ও আতঙ্ক ও হামলার মুখে পড়ে।

বিবৃতিতে বলা হয়, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অভিযোগ ওঠে, জনতা জড়ো হয়, পুলিশ দ্রুত অভিযুক্তকে আটক করে। অথচ কোনো যথাযথ ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই বাড়িঘর, দোকানপাট, মন্দির এবং পুরো পরিবার ভয়ের মধ্যে পড়ে যায়।”

দীপ্ত রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘মিথ্যা’ বলে দাবি

এইচআরসিবিএম জানায়, দীপ্ত রায়ের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ “মিথ্যা এবং একটি অজুহাত তৈরি করে করা হয়েছে।”

সংস্থাটি জানায়, তারা মামলার প্রথম তথ্য প্রতিবেদন (এফআইআর)-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করেছে। সেখানে একটি কথিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, পুলিশি হেফাজত, একটি মোবাইল ফোন জব্দ এবং দণ্ডবিধি ও সাইবার-সংক্রান্ত আইনের বিভিন্ন ধারার উল্লেখ রয়েছে।

তবে সংস্থাটির দাবি, গ্রেপ্তারের সময় পর্যন্ত নথিপত্রে এমন কোনো ফরেনসিক প্রমাণ ছিল না, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বিতর্কিত পোস্টটি দীপ্ত রায় নিজে লিখেছেন, প্রকাশ করেছেন, পরিচালনা করেছেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচার করেছেন।

এইচআরসিবিএমের মতে, পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, অভিযোগ ওঠার পর দীপ্ত রায়ের পরিবারের বাড়ি, জীবিকা এবং স্থানীয় একটি হিন্দু উপাসনালয় হামলার শিকার হয়।

এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্তের ফল প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে পুলিশও জব্দ করা মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষার কোনো ফলাফল প্রকাশ করেনি।

ছয় মাসে ১৭টি ঘটনা

এইচআরসিবিএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগসংক্রান্ত অন্তত ১৭টি ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে।

সংস্থাটি জানায়, বছরের প্রথম চার মাসে ছয়টি ঘটনা নথিভুক্ত হলেও মে ও জুন—এই দুই মাসেই আরও ১১টি ঘটনা ঘটেছে। তাদের মতে, এটি উদ্বেগজনক হারে এ ধরনের অভিযোগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।

এর আগে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে এইচআরসিবিএম দাবি করেছিল, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অন্তত ৭৩ জন সংখ্যালঘু যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

‘অভিযোগই শাস্তিতে পরিণত হচ্ছে’

এইচআরসিবিএম বলছে, তাদের উদ্বেগের মূল বিষয় কেবল অভিযোগের সত্যতা নয়; বরং অভিযোগ ওঠার পর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার পরিবার কার্যত শাস্তির মুখোমুখি হয়ে পড়ছেন।

সংস্থাটি বলেছে, “আদালত ঘটনার সত্যতা নির্ধারণের আগেই, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা কোনো অ্যাকাউন্ট হ্যাক, ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত, বিকৃত বা অন্য কারও নামে চালানো হয়েছে কি না তা যাচাই করার আগেই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। পরিবারের সদস্যরা হুমকির মুখে পড়েন, সম্পত্তিতে হামলা হয় এবং পুরো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আতঙ্কের মধ্যে পড়ে।”

এইচআরসিবিএমের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে অভিযোগই অনেক সময় শাস্তিতে পরিণত হয়। আদালতের রায়ের আগেই অভিযুক্ত ব্যক্তি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হন।

সংস্থাটি বলেছে, “বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের জন্য এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি সামাজিক ধ্বংসের একটি পুনরাবৃত্ত পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে।”

তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে শত শত সংখ্যালঘু যুবক ও পরিবার ভুয়া, বিকৃত, হ্যাক করা, অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি অথবা যাচাইবিহীন ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের শিকার হয়েছে।

সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান

এইচআরসিবিএম বাংলাদেশ সরকার, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক সংস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি এ ধরনের অভিযোগের অপব্যবহারকে “জাতীয় পর্যায়ের সংখ্যালঘু সুরক্ষা জরুরি অবস্থা” হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।

সংস্থাটি বলেছে, তাহিরপুরের ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন স্থানীয় ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “আজকের বাংলাদেশে একটি মাত্র অভিযোগ একজন সংখ্যালঘু যুবকের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে, একটি পরিবারকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, একটি মন্দিরের ক্ষতি করতে পারে এবং পুরো একটি সম্প্রদায়কে অবরুদ্ধ অবস্থায় ঠেলে দিতে পারে। রাষ্ট্র এই চক্র ভাঙতে না পারলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ শুধু আইনি বিষয় হিসেবেই থাকবে না; এটি ভয়, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক ধ্বংস এবং সামষ্টিক শাস্তির একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে থাকবে।”

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের একটি মূল্যায়নে বলা হয়, সাংবিধানিক সুরক্ষা থাকলেও বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সাইবার আইনের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলার ঘটনা তুলে ধরে। একই সঙ্গে সংস্থাটি ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা নিশ্চিত, নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।

তবে এইচআরসিবিএমের সর্বশেষ অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles