টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট একাধিক ভূমিধসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ও আশপাশের এলাকায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আটজন রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দা। নিহতদের মধ্যে দুটি পরিবারের সাত সদস্য রয়েছেন। এছাড়া বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং অসংখ্য বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবার ভোরে কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থিত বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ধসের এসব ঘটনা ঘটে। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢাল নরম হয়ে পড়ায় মাটি ধসে বাঁশ, কাঠ ও ত্রিপল দিয়ে নির্মিত অস্থায়ী ঘরবাড়ি মাটিচাপা পড়ে। ঘটনাগুলোর সময় অধিকাংশ বাসিন্দাই ঘুমিয়ে ছিলেন।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম শাজাদুর রহমান ভয়েসকে জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে আটজন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা এবং একজন কক্সবাজার পৌর এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, ভারী বৃষ্টিজনিত ভূমিধসে শরণার্থী শিবিরে বহু বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
চারটি স্থানে ভূমিধস
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের অন্তত চারটি স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে বেশ কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র। একই সময় কক্সবাজার শহরের একটি পাহাড়ের অংশ ধসে একটি বাড়ির ওপর পড়লে সেখানে একজন বাংলাদেশি নিহত হন এবং তাঁর পরিবারের আরও দুজন আহত হন।
কক্সবাজারে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা তুম্পা দাস জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির কারণে নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়েছে এবং এখনো হাজারো রোহিঙ্গা অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢালে বসবাস করছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সোমবার রয়টার্সকে বলেন, “আর কোনো প্রাণহানি এড়াতে আমরা যত দ্রুত সম্ভব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নিচ্ছি।” তিনি জানান, উদ্ধারকারী দল, স্বেচ্ছাসেবক এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ একযোগে উদ্ধার ও স্থানান্তর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস
স্থানীয় আবহাওয়া কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার জেলায় ২৫০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী কয়েক দিন আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে নতুন করে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক রয়েছে প্রশাসন।
বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতি। সেখানে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।
বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর জন্য অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড় কেটে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হওয়ায় শিবিরের বড় অংশই খাড়া ও বন উজাড় হওয়া পাহাড়ি ঢালে গড়ে ওঠে। অধিকাংশ পরিবার এখনো বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঘরে বসবাস করে। ফলে বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকা ভূমিধসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রতিবছরই ফিরে আসে একই সংকট
বাংলাদেশে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য অঞ্চলে প্রায়ই ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। অতিবৃষ্টি, পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অনিয়ন্ত্রিত বসতি স্থাপন এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা গত কয়েক বছরে শিবিরে পাহাড়ি ঢাল স্থিতিশীল করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বালুর বস্তা স্থাপন, গাছ লাগানো এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেও প্রাকৃতিক ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। ইউরোপীয় কমিশনের মানবিক সহায়তা বিভাগও সম্প্রতি জানিয়েছে, কক্সবাজারের পাহাড়ি শিবিরগুলোতে বসবাসকারী লাখো রোহিঙ্গা প্রতি বর্ষায় ভূমিধস ও বন্যার উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
সীমান্ত পরিস্থিতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংঘাত বাড়তে থাকায় বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় নতুন করে রোহিঙ্গাদের জড়ো হওয়ার খবর পাওয়ায় পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে বর্ষাজনিত দুর্যোগ পরিস্থিতি মানবিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

