জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ইনিংস ও ৮৫ রানের লজ্জাজনক হারের ক্ষত এখনো তাজা। তবে সেই হতাশা পেছনে ফেলে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে নতুন শুরুর প্রত্যাশায় আগামীকাল মাঠে নামছে বাংলাদেশ। সোমবার হারারে স্পোর্টস ক্লাবে শুরু হওয়া সিরিজে টাইগারদের লক্ষ্য হবে নিজেদের শক্তির জায়গা—৫০ ওভারের ক্রিকেটে—আবারও সাফল্যের ধারায় ফেরা।
হারারে অনুষ্ঠিত একমাত্র টেস্টে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই জিম্বাবুয়ের কাছে পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ম্যাচ শেষ হয়ে যায়, যা জিম্বাবুয়ের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জয়। তবে এই অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের কারণে বাংলাদেশ অতিরিক্ত দুই দিন সময় পেয়েছে নিজেদের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে ওয়ানডে সিরিজের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য।
ওয়ানডেতে সাম্প্রতিক সাফল্যই বাংলাদেশের বড় ভরসা
টেস্টে ব্যর্থ হলেও ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে দলকে।
সবশেষ চারটি ওয়ানডে সিরিজেই জয় পেয়েছে টাইগাররা। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য ছিল ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়—যা ছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ঘরের মাঠের ওয়ানডে সিরিজ জয়। এছাড়া নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের বিপক্ষেও সিরিজ জিতে নিজেদের সাদা বলের ক্রিকেটে শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ।
এ কারণে টিম ম্যানেজমেন্টের বিশ্বাস, টেস্টের ব্যর্থতা নয়, বরং সাম্প্রতিক ওয়ানডে পারফরম্যান্সই দলের প্রকৃত সামর্থ্যের প্রতিফলন।
টেস্টে বিশ্রামে থাকা তিন প্রধান পেসার—মুস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম—ওয়ানডে দলে ফিরছেন। তাদের প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্বে অভিজ্ঞ ও তরুণ ক্রিকেটারদের সমন্বয়ে গড়া দলটি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ জিতে আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে চায়।
টেস্ট জয়ের উচ্ছ্বাস নিয়ে মাঠে নামছে জিম্বাবুয়ে
অন্যদিকে, ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওয়ানডে সিরিজে নামছে স্বাগতিক জিম্বাবুয়ে।
একমাত্র টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরি করে আলোচনায় আসেন ওপেনার ইনোসেন্ট কাইয়া। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই ম্যাচজয়ী ইনিংসের পুরস্কার হিসেবে তিনি আবারও ওয়ানডে দলে জায়গা পেয়েছেন। বাংলাদেশ সফরে জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের হয়েও ভালো পারফরম্যান্স করেছিলেন ৩৩ বছর বয়সী এই ব্যাটার।
জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট বোর্ড ১৫ সদস্যের যে দল ঘোষণা করেছে, তার নেতৃত্বে রয়েছেন বাঁহাতি পেসার রিচার্ড এনগারাভা। জাতীয় দলের হয়ে এই প্রথম ওয়ানডেতে অধিনায়কত্ব করবেন তিনি। টেস্টেও তিনিই দলকে নেতৃত্ব দিয়ে ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়েছিলেন।
দলে ফিরেছেন অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার রায়ান বার্ল, তাদিওয়ানাশে মারুমানি ও ওয়েলিংটন মাসাকাদজা। টেস্ট মিস করা তারকা অলরাউন্ডার সিকান্দার রাজাও ফিরেছেন ওয়ানডে দলে।
এছাড়া টেস্টে দুর্দান্ত বোলিং করা ব্লেসিং মুজারাবানির গতি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইতিহাস বাংলাদেশের পক্ষে, তবে সতর্ক থাকার কারণও আছে
পরিসংখ্যান বলছে, ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের রেকর্ড বেশ সমৃদ্ধ।
দুই দল এখন পর্যন্ত ৮১টি ওয়ানডে ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ জিতেছে ৫১টি এবং জিম্বাবুয়ে জিতেছে ৩০টি।
তবে সাম্প্রতিক ইতিহাস স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।
২০২২ সালে জিম্বাবুয়ের মাটিতে সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল স্বাগতিকরা। ফলে নিজেদের কন্ডিশনে আবারও ভালো কিছু করার আশা করছে তারা।
দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান বাংলাদেশের কোচের
টেস্টে বড় ব্যবধানে হারের পরও বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস হারাতে নিষেধ করেছেন।
হারারের টেস্ট শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “গত কয়েক মাসে আমরা খুব ভালো ওয়ানডে ক্রিকেট খেলেছি। একটি খারাপ টেস্ট আমাদের গড়ে তোলা আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিতে পারে না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারি।”
অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক রিচার্ড এনগারাভা টেস্ট জয়কে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দলের লক্ষ্য ছিল ইতিহাস গড়া।
টেস্ট জয়ের পর ইএসপিএনক্রিকইনফোকে তিনি বলেন, “ম্যাচে নামার আগে আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল—ইতিহাস গড়তে হবে। আমরা দারুণ একদল পেসার পেয়েছি। সবাই কঠোর পরিশ্রম করেছে বলেই আজ আমরা এই অবস্থানে পৌঁছেছি।”
তিনি আরও বলেন, “নিজেদের কন্ডিশন আমরা খুব ভালোভাবে জানি। এখানকার পরিবেশ আমাদের পরিচিত। এই সুবিধাটা কাজে লাগিয়ে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই।”
এরপর টি-টোয়েন্টি সিরিজ
সোমবার শুরু হওয়া প্রথম ওয়ানডির পর একই ভেন্যু হারারে স্পোর্টস ক্লাবেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হবে যথাক্রমে ৯ ও ১১ জুলাই।
এরপর দুই দল বুলাওয়েওয়েতে যাবে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলতে।
একদিকে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জয়ের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের উচ্ছ্বাস—এই দুই ভিন্ন গতিপথ নিয়ে দুই দল যখন মাঠে নামছে, তখন সিরিজটি যে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
বাংলাদেশ দল
মেহেদী হাসান মিরাজ (অধিনায়ক), সৌম্য সরকার, মোহাম্মদ সাইফ হাসান, তানজিদ হাসান তামিম, নাজমুল হোসেন শান্ত (সহ-অধিনায়ক), তাওহীদ হৃদয়, লিটন দাস, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, নুরুল হাসান সোহান, রিশাদ হোসেন, তানভীর ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম ও নাহিদ রানা।
জিম্বাবুয়ে দল
রিচার্ড এনগারাভা (অধিনায়ক), ব্রায়ান বেনেট, রায়ান বার্ল, বেন কারান, ক্রেগ আরভিন, ব্র্যাড ইভান্স, ইনোসেন্ট কাইয়া, ক্লাইভ মাদান্দে, ওয়েসলি মাধেভেরে, তাদিওয়ানাশে মারুমানি, ওয়েলিংটন মাসাকাদজা, আর্নেস্ট মাসুকু, ব্লেসিং মুজারাবানি, নিউম্যান নিয়ামহুরি ও সিকান্দার রাজা।

