বাঁশখালী, চট্টগ্রাম — ১১ মাস বয়সী ছেলেকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে ধরে জলমগ্ন সড়কে নামলেন মফিজুল আলম। শিশুটিকে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে মাথার ওপর ধরে রেখেছেন ছাতা। ঠিক পেছনেই হাঁটছিলেন তাঁর স্ত্রী নাসিমা আলম।
মনকিচরে তাঁদের বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নার আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না। শনিবার, ১১ জুলাই নাগাদ পানি প্রায় বিছানা ছুঁইছুঁই করছিল। শেষ পর্যন্ত ঘরে তালা দিয়ে হাঁটুপানি মাড়িয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের একটি আশ্রয়কেন্দ্রের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা।
মফিজুল ও নাসিমার এই ঘর ছাড়ার দৃশ্য দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া দুর্যোগের মানবিক চিত্রই তুলে ধরে। কয়েক দিনের প্রবল মৌসুমি বৃষ্টি, পার্বত্য এলাকা থেকে নেমে আসা ঢল এবং উপকূলে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ও মুঠোফোন সেবা বন্ধ হয়ে পড়েছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছে অসংখ্য পরিবার।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবার পর্যন্ত বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাত জেলার ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
আগে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকা এলাকা থেকে খবর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভূমিধসে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। খাড়া ও ব্যাপকভাবে বৃক্ষশূন্য পাহাড়ে মূলত বাঁশ ও প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি আশ্রয়ে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন।
বিশুদ্ধ পানির জন্য দীর্ঘ পথ
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর একটি বাঁশখালী। এখানকার বহু পরিবারের জন্য আরেকটি দিন টিকে থাকা এখন নির্ভর করছে সামান্য শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহের ওপর।
মনকিচরের কাছে প্লাবিত একটি সড়কে দুই যুবক ও এক কিশোরকে মাথা ও কাঁধে চারটি পানির কলস বহন করতে দেখা যায়। বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহের জন্য তাঁদের প্রায় এক কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়েছে।
পানি নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ফেরার পথে স্থানীয় বাসিন্দা নেয়ামত হোসেন দ্য ভয়েসকে বলেন, “তিন দিন ধরে আমাদের বাড়িঘর পানির নিচে। খাবারের সংকট চলছে, বিশুদ্ধ পানিও নেই। আমার মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানেরা আশ্রয়কেন্দ্রে আছে। পানি আরও বাড়লে হয়তো আবার এখানে এসে পানি নিয়ে যেতে পারব না।”
কাছেই ৬২ বছর বয়সী কুতুব বেপারী লাঠিতে ভর দিয়ে বন্যার পানির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ছেলে সাইজুদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে একই দুর্গম পথ পাড়ি দিচ্ছিলেন ৫৫ বছর বয়সী শাকিলা বেগম।
আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে শাকিলা দ্য ভয়েসকে বলেন, “১৯৯১ সালেও এত পানি দেখিনি। সকালে আমাদের ঘরে পানি ঢোকে। পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে দেখে আমরা বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই।”
চট্টগ্রামের উপকূলীয় মানুষের কাছে তাঁর ১৯৯১ সালের স্মৃতির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ওই বছরের এপ্রিলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে আনুমানিক ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। নিহতদের বড় একটি অংশ ছিলেন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বাসিন্দা। সেই দুর্যোগের স্মৃতি এখনো প্রবীণ উপকূলবাসীকে বিপদের মাত্রা বুঝতে এবং কখন ঘর ছাড়তে হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে।
আশ্রয় মিললেও নেই পর্যাপ্ত খাবার ও পানি
বাঁশখালীর আটটি উপকূলীয় ইউনিয়ন প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জলদী সদর, শিলকূপ, গণ্ডামারা, বাহারছড়া ও শেখেরখীলের বিভিন্ন সড়কে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে। আগের দিন পর্যন্ত শুকনা থাকা অনেক ঘরেও পানি ঢুকতে শুরু করেছে।
পূর্ব ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে ১২টি বাস্তুচ্যুত পরিবার বৃহস্পতিবার রাত থেকে অবস্থান করছিল। তাদের অভিযোগ, শনিবার পর্যন্ত কোনো সরকারি প্রতিনিধি সেখানে যাননি কিংবা খাবার পৌঁছে দেননি। আশ্রয়কেন্দ্রে নির্ভরযোগ্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের একটি দোকান থেকে পানি কিনে আনতে হচ্ছে।
আশ্রয়কেন্দ্রটি পরিদর্শনের সময় বাসিন্দা সারওয়ার হোসেন বাংলা দৈনিক সমকালকে বলেন, “বাড়ি থেকে চাল ও আলু নিয়ে এসেছিলাম। সেগুলো শেষ হয়ে গেছে। এখন মুড়ি খেয়ে বেঁচে আছি এবং একবারে এক গ্লাস করে পানি পান করছি। এখানে থাকা অন্য পরিবারগুলোর অবস্থাও একই।”
তাঁর বক্তব্য দুর্যোগ মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা সামনে এনেছে। কোনো ভবনকে আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করলেই সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত হয় না। বিশুদ্ধ পানি, রান্না করা অথবা সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া যায় এমন খাবার, শৌচাগার, ওষুধ, আলো ও নিরাপত্তার পাশাপাশি শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
শুক্রবার প্রকাশিত সরকারি তথ্যে বলা হয়, চট্টগ্রাম বিভাগের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে সেগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে মাত্র ১২ হাজারের কিছু বেশি মানুষ। অথচ পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা কয়েক লাখ। সেই তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত কম।
এই বড় ব্যবধানের কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাদের অনেকেই আত্মীয়ের বাড়িতে, উঁচু সড়কে অথবা নিজের বাড়ির ওপরের তলায় আশ্রয় নিয়েছেন। প্রবল স্রোত, নৌকার সংকট কিংবা সময়মতো উদ্ধার সহায়তা না পাওয়ায় অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। আশ্রয়কেন্দ্রের অপর্যাপ্ত পরিবেশের কারণেও পরিবারগুলো ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ও অবশিষ্ট সম্পদ ছেড়ে যেতে অনিচ্ছুক।
সরকারি ত্রাণের হিসাব ও দুর্গত মানুষের অভিজ্ঞতায় ব্যবধান
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ত্রাণের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
তিনি দ্য ভয়েসকে বলেন, “বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২ হাজার ৫০০ পরিবারের মধ্যে ৪৪ টন চাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করেছি। এখন সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জন্য সরকার সামগ্রিকভাবে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ৪৫০ টন চাল বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে। সরকারি ব্রিফিং অনুযায়ী, আশ্রয়কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুখাদ্য এবং দিনে তিন বেলা খাবার দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কাগজে এসব বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য মনে হলেও পূর্ব ইলশা ও অন্যান্য দুর্গম এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষিত সহায়তা এবং বাস্তবে দুর্গত পরিবারের কাছে পৌঁছানো ত্রাণের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।
কোন ইউনিয়নে কত খাবার, পানি ও ওষুধ পাঠানো হয়েছে, কখন পৌঁছেছে এবং কতজন তা পেয়েছেন—এসব তথ্য ইউনিয়নভিত্তিকভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। স্বচ্ছ বিতরণ-তথ্য অবহেলিত এলাকা শনাক্ত করার পাশাপাশি একই স্থানে বারবার ত্রাণ দেওয়া, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা ত্রাণ আত্মসাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
বিদ্যুৎ ও মুঠোফোন সেবা বন্ধ, উদ্ধারকাজে বাধা
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় ৪৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন ছিল। কয়েকটি এলাকায় মুঠোফোনের টাওয়ার অচল হয়ে পড়ায় পরিবারগুলো স্বজন কিংবা জরুরি সেবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। ঘরের মধ্যে আটকে পড়া মানুষকে শনাক্ত করাও উদ্ধারকারীদের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।
বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ও সড়ক যোগাযোগ একসঙ্গে ভেঙে পড়ার ঘটনা দুর্যোগপ্রবণ এলাকার জরুরি অবকাঠামোর সীমিত সক্ষমতা প্রকাশ করেছে। বর্ষার জরুরি পরিস্থিতির আগে মুঠোফোন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সচল বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জ্বালানি ও দ্রুত সংযোগ পুনঃস্থাপনের দল প্রস্তুত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের জরুরি অনুরোধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন মোতায়েন করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে স্পিডবোট ও জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট নিয়ে যান সেনাসদস্যরা। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য ২৪ পদাতিক ডিভিশন তিনটি কার্যক্রম পরিচালনা শিবিরও স্থাপন করে।
শুক্রবার রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধার করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে বলেও জানানো হয়।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের দলও কাজ করছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, চেচুরিয়ায় জরুরি ফোন পেয়ে অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা বন্যার পানিতে ঘেরা একটি বাড়ি থেকে একই পরিবারের ১৩ সদস্যকে উদ্ধার করেন। তাঁদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও একটি শিশু ছিল।
নিহতদের মধ্যে শিশুরাও
হঠাৎ সৃষ্ট স্রোত ও বাড়ির চারপাশে জমে থাকা পানিতে শিশুরা বিশেষ ঝুঁকিতে পড়েছে।
সাতকানিয়ার দক্ষিণ রূপকানিয়া এলাকায় পরিবারের সদস্যদের অগোচরে পানিতে নেমে দুই বছর বয়সী ইসমাইল হোসেন ডুবে যায়। খোঁজাখুঁজির পর তাকে উদ্ধার করে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয় ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তা শামসুজ্জামান এ তথ্য জানিয়েছেন।
শুক্রবার বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে পৃথক ঘটনায় ছয় বছর বয়সী মিরাজ এবং ১১ বছর বয়সী আশিক পানির স্রোতে ভেসে যায়।
সড়ক, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকা পানির নিচে
দুর্যোগের বিস্তার কেবল বাঁশখালীতেই সীমাবদ্ধ নেই।
সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার পথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কয়েকটি বিভাগের সেবা ব্যাহত হচ্ছে। চন্দনাইশের কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও প্রায় ২০ হাজার মানুষ জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে। ঘরবাড়ি, উঠান, গ্রামীণ সড়ক, কৃষিজমি ও মাছের ঘের এখনো পানির নিচে।
ফটিকছড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্লাবিত সড়কের কারণে শত শত পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। লক্ষ্মীছড়ি অঞ্চলের অধীনে কর্মরত সেনাসদস্যরা সুন্দরপুর, হারুয়ালছড়ি ও আশপাশের এলাকার ১০০টি পরিবারের কাছে খাবার ও জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় কবাখালী ও মেরুং ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লংগদু ও মারিশ্যার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং হাজারো পরিবার আশ্রয়ের সন্ধানে রয়েছে। চেঙ্গী নদীর পানি কমতে শুরু করায় খাগড়াছড়ি শহরের কয়েকটি এলাকা থেকে পানি সরে গেলেও নিচু অঞ্চলগুলো এখনো প্লাবিত। কৃষকেরা ফসল, সবজিখেত, মাছের ঘের ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।
পাহাড়ি ঢলের চাপে রাঙ্গুনিয়ায় রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের একটি সেতুর সংযোগপথ ধসে পড়েছে। এতে দুই পার্বত্য জেলার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, পানি নেমে গেলে অস্থায়ী বেইলি সেতু স্থাপন করা যেতে পারে। তবে সড়কটি পুনরায় চালু করতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
পানি বেড়ে যাওয়ায় কর্ণফুলী নদীর ফেরি চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে বান্দরবানে যাওয়ার আরেকটি সম্ভাব্য পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্যার পর দেখা দিতে পারে জনস্বাস্থ্য সংকট
পানি কমতে শুরু করলেই তাৎক্ষণিক বিপদ শেষ হবে না। বন্যার পানি পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য, রাসায়নিক পদার্থ ও প্রাণীর বর্জ্যের মাধ্যমে নলকূপ, সংরক্ষিত খাবার এবং গৃহস্থালির পানি দূষিত করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা অনুযায়ী, বন্যার পানির সংস্পর্শে আসা খাবার অনিরাপদ হয়ে পড়তে পারে। দূষিত পানি ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে।
যেসব আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ হিসাব করে অল্প পানি পান করছে এবং পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই, সেখানে এই ঝুঁকি আরও বেশি। মফিজুল আলমের ১১ মাস বয়সী ছেলের মতো শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী, প্রবীণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পানিশূন্যতা, সংক্রমণ ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার কারণে বাড়তি বিপদের মুখে রয়েছেন।
জরুরি ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসক দল মোতায়েন, পানির উৎস পরীক্ষা ও জীবাণুমুক্ত করা এবং পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি ও খাবার স্যালাইন বিতরণ করা প্রয়োজন। নারীদের জন্য আলাদা ও নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ পুনঃস্থাপনকে পরবর্তী পর্যায়ের পুনর্বাসনকাজ হিসেবে না দেখে জীবন রক্ষাকারী জরুরি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।
জলবায়ুর চাপের সঙ্গে প্রতিরোধযোগ্য দুর্বলতা
বাংলাদেশে মৌসুমি বন্যা নতুন নয়। তবে উষ্ণায়নের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় অতিবৃষ্টির তীব্রতা বাড়ছে। উষ্ণ বাতাস বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে, ফলে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টির আশঙ্কাও বাড়ে। একই সঙ্গে অনিয়মিত মৌসুমি আবহাওয়ার কারণে কখনো প্রবল বৃষ্টি, আবার কখনো দীর্ঘ শুষ্ক সময় দেখা দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন দুর্যোগের মাত্রা বাড়াতে পারে, কিন্তু অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, দুর্বল অবকাঠামো, পাহাড় ও বন উজাড়, অপ্রতুল সুবিধার আশ্রয়কেন্দ্র এবং অসম ত্রাণ বিতরণ প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে প্রতিরোধযোগ্য মানবিক দুর্ভোগে পরিণত করছে।

