কারখানার আলো নিভছে, চাপ বাড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে

গাজীপুরের ধারাবাহিক কারখানা বন্ধের ঘটনা দেশের পোশাকশিল্পের গভীর সংকটের প্রতীক; রপ্তানি কমছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, বিনিয়োগে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।

ঢাকা: বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প এখন এক কঠিন সময় পার করছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে একের পর এক পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে, সাময়িকভাবে বন্ধ করছে কিংবা স্থায়ীভাবে কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ছেন, বিনিয়োগে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা এবং দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুরে কারখানা বন্ধের ঘটনাগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এলেও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো একটি জেলার সমস্যা নয়। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়াসহ অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। রপ্তানি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করা, গ্রেপ্তারের আতঙ্ক, মব হামলা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পরিবহন, প্যাকেজিং, ব্যাংকিং, লজিস্টিকস, ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ আরও কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই শিল্পে অস্থিরতা শুধু কারখানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে।

গাজীপুরে সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গাজীপুরে শিল্প সংকট সবচেয়ে প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। সরকারি তথ্য ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তত ১৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ বা উৎপাদন স্থগিত হয়েছে। এতে কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

কারখানাগুলোর ঘোষিত কারণ ভিন্ন হলেও মূল সমস্যা প্রায় একই—গ্যাসের সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং পণ্যের দাম না বাড়ায় মুনাফা কমে যাওয়া। এর সঙ্গে শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

শ্রমিক মৃত্যুর পর বন্ধ ইসলাম গার্মেন্টস

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ইসলাম গার্মেন্টস লিমিটেডের (ইউনিট-২) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা।

গাজীপুর মহানগরের জরুণ এলাকায় অবস্থিত কারখানাটির শ্রমিক রুবিনা বেগম অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ভাঙচুরের আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। এতে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনাটি তাৎক্ষণিক কারণ হলেও প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকটে পরিচালিত হচ্ছিল।

লিথি গ্রুপ ও ইউনিকের কারখানা বন্ধ

এর আগে গাজীপুরের বাঘের বাজার এলাকায় লিথি গ্রুপের পাঁচটি কারখানা একযোগে উৎপাদন বন্ধ করে। কর্তৃপক্ষ গ্যাস-সংকট, ক্রয়াদেশ হ্রাস, ভবিষ্যৎ অর্ডার নিয়ে অনিশ্চয়তা, শ্রমিক অসন্তোষ, পণ্যের কম দাম এবং ব্যাংকিং সহায়তার ঘাটতিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।

এদিকে ইউনিক ডিজাইনার্স লিমিটেড ও ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। পরবর্তীতে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের বিষয়ে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সমঝোতা হলেও হারিয়ে যাওয়া কর্মসংস্থান আর ফিরে আসেনি।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, “আর্থিক সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে কর্তৃপক্ষ কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। কারখানা বন্ধের ফলে শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিট, বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের বিষয়ে উভয় পক্ষের সম্মতিতে ১১টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

কালিয়াকৈরের চন্দ্রা শিল্পাঞ্চলে এপেক্স গ্রুপের চারটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে ফ্যাশন লিংকার্স লিমিটেড ও কোরটেক্স অ্যাপারেলস লিমিটেড-সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও বন্ধ হয়েছে। যদিও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর আশা করছে, কিছু কারখানা আবার চালু হতে পারে; তবে সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি নেই।

শুধু কারখানা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো অর্থনীতি

একটি পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার অর্থ শুধু কয়েকশ বা কয়েক হাজার শ্রমিকের চাকরি হারানো নয়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, খাবারের দোকান, বাসাভাড়া, ক্ষুদ্র ব্যবসা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অসংখ্য পরিবারের আয়ের ওপর। অর্থনীতিবিদদের মতে, একই সময়ে একাধিক কারখানা বন্ধ হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ভোগব্যয় কমে যায়, ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নতুন বিনিয়োগের আগ্রহও হ্রাস পায়।

গাজীপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু একটি জেলার সংকট নয়; বরং বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্প অর্থনীতির সামনে তৈরি হওয়া একটি বড় সতর্কবার্তা।

রপ্তানি কমছে, বাড়ছে ব্যয়

গাজীপুরে কারখানা বন্ধের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সংকট নয়; এর পেছনে রয়েছে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি খাতের দুর্বল হয়ে পড়ার বাস্তব চিত্র।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ০.৫৮ শতাংশ কম। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া তৈরি পোশাক খাতেও ১.৬৪ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রপ্তানি আয়ের এই পতন বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কেন বাড়ছে সংকট?

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, একাধিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কারণ একসঙ্গে কাজ করায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

গত এক বছরে শ্রমিকদের মজুরি, সুতা, ডাইং ও কেমিক্যাল, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যাংকঋণের সুদের হার। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যত লাভ ছাড়াই উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখা এবং দীর্ঘদিনের ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেই অনেক মালিক লোকসান মেনে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাসের সংকট ও উচ্চ সুদের ঋণ। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কার্যকর মূলধন জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে কারখানাগুলো নানাবিধ চাপে আছে। বেশ কিছু কারখানা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক কারখানা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে হামলা করে লুটপাট চালানো হয়। অনেক ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে রাখা হয়েছে। কেউ কেউ জামিন পেলেও অনেকেই এখনো ছাড়া পাননি। বিচার ছাড়াই দু’বছর যাবত কারাবাস করছে অনেক শিল্পদ্যোক্তা। এছাড়া ছোট-বড় হাজার হাজার উদ্যোক্তা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। গ্রেপ্তারের আতঙ্ক, মব হামলা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং নিরাপত্তাহীন পরিবেশও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও বাড়ছে

দেশীয় সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা বেড়েছে।

ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো উচ্চমূল্যের পোশাক, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পণ্য, স্পোর্টসওয়্যার ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল উৎপাদনে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো প্রধানত তুলাভিত্তিক পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

আস্থার সংকট কাটানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে আস্থার অভাব।

কারখানা মালিকরা ভবিষ্যৎ অর্ডার নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন, নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করছেন অনেক উদ্যোক্তা, ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে এবং শ্রমিকদের মধ্যেও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও বলেছেন, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক চাপ বর্তমানে পোশাক শিল্পের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

ঘুরে দাঁড়ানোর পথ

শিল্প উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকট থেকে উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের বিকল্প নেই। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ, নতুন রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং শিল্পাঞ্চলে নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাকে তাঁরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল দ্য ভয়েস-কে বলেন, “গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সম্ভাবনাময় শিল্পখাতগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা দিতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। তবে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; বাস্তবায়নের জন্য সময়ভিত্তিক জাতীয় রপ্তানি কৌশল প্রয়োজন।”

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles