বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বর্তমান পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় সতের বছর লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন। তার এই নির্বাসন স্বেচ্ছায় ছিল না। ২০০৭ সালে এক-এগারোর সরকারের ক্ষমতায় আসার আগে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার বড় ছেলে। মায়ের শাসনকালে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন দেশে একটি সমান্তরাল সরকার পরিচালনা করার কারণে। তার এই কাজ করার জন্য তিনি গুলশানে ‘হাওয়া ভবন’ নামের একটি ভবনে দপ্তরও খুলে বসেছিলেন। সেই ভবন হতে পরিচালিত হতো দেশের সকল উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকাণ্ড। বলা হয়, তারেক রহমানকে দেশের সকল উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের কমপক্ষে দশ শতাংশ না দিয়ে কেউ কোনো কাজ করতে পারত না। তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘মিস্টার টেন পার্সেন্ট’। এই সব খবর সারা দুনিয়া জানে। এই কারণে তার ওপর মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল এবং বাংলাদেশে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস আর. মরিয়ার্টি ওয়াশিংটনে তারবার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, লোকটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপদজনক; সুতরাং তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হোক। সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে—তেমন খবর এখনো পাওয়া যায়নি।
তারপর সেই ভয়াবহ এক-এগারোর অন্ধকারকাল। দেশের ক্ষমতা দখল করল সেনাসমর্থিত মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকার। বেগম জিয়া আর শেখ হাসিনাসহ আটক হলেন দেশের সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। বেগম জিয়ার দুই পুত্র, তারেক রহমান আর আরাফাত রহমান কোকো সেনাবাহিনীর হাতে শুধু আটকই হননি, তাদের ওপর চরম শারীরিক নির্যাতনও করা হয়েছিল। জোরপূর্বক তাদের নির্বাসনে যেতে হয়েছে। তারেক রহমান দেশ ছাড়ার আগে মুচলেকা দিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি আর কখনো রাজনীতি করবেন না। নির্বাসনে থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয় আরাফাত রহমানের। তারেক রহমান লন্ডনে দীর্ঘ চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে অনেকটা সুস্থ। লন্ডনে থাকা অবস্থায় বিএনপির চেয়ারপারসন পদের দায়িত্বে চলে আসেন তারেক রহমান। এ সময়ে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম জিয়া দুর্নীতির দায়ে কারাভোগ করছিলেন। শারীরিকভাবেও তিনি সুস্থ ছিলেন না।
এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ২০২৪-এর আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শূন্যতা দেখা দেয়। এটি স্বাভাবিক যে, প্রত্যাশিত ছিল—এই শূন্যতা পূরণ করবে কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি। কিন্তু তা না হয়ে হলো ঠিক উল্টো। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ছিল নোবেল লরিয়েট ড. ইউনুসের মেটিকুলাস ষড়যন্ত্র, যা তিনি নিজেই পরবর্তীকালে স্বীকার করেছেন। পাঁচ আগস্ট শেখ হাসিনার বিদায়ের পর ইউনুস প্যারিস থেকে এসে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী অবতার হয়ে দেশের ক্ষমতা দখল করলেন। দৃশ্যপটে তারেক রহমান নেই। তখন লন্ডনে বসে দর্শক হওয়া ছাড়া তার আর কোনো ভূমিকা ছিল না। দলের নেতা-কর্মীরা অপেক্ষা করছেন, তাদের নেতা কখন আসবেন।
ইউনুস চৌদ্দ মাস অসাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ শাসন করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ নানা রকমের শাসন দেখেছে। বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করার পর দেশে জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসন দেখেছে, বেগম জিয়ার নির্বাচিত সরকার দেখেছে, আবার মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের দুই বছরের অসাংবিধানিক জবরদস্তিমূলক সরকার দেখেছে। বাংলাদেশে দুই দফায় শেখ হাসিনার কুড়ি বছরের শাসন দেখেছে, কিন্তু ইউনুসের শাসনের মতো এত ভয়ংকর দুর্নীতিগ্রস্ত অপশাসন দেখেনি। সব সরকারের আমলে কমবেশি দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু ইউনুসের আমলে দুর্নীতিকে যেভাবে তিনি একটি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন, তা অন্য কোনো সরকারের আমলে হয়নি। ইউনুস ক্ষমতা দখল করে সবার আগে তার গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে যত রকমের দুর্নীতির মামলা ছিল, তা তিনি এক কলমের খোঁচায় শুধু বাতিলই করে দেননি, একই সঙ্গে ২০২৯ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের সকল ধরনের কর মওকুফ করিয়ে নিয়েছেন। গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃক দেওয়া ছয় হাজার ছয়শত কোটি টাকার বকেয়া করও মওকুফ করিয়ে নিয়েছেন।
ড. ইউনুস একটি দীর্ঘমেয়াদি সময়ের জন্য দেশে দখলদারিত্ব বজায় রাখার খোয়াব নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তার এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য তিনি নিয়ে এসেছিলেন উপদেষ্টা পদবিধারী কিছু নষ্ট, অদক্ষ, চরিত্রহীন, দুর্নীতিপরায়ণ মানুষকে। নিজ স্বার্থে দেশের সিভিল প্রশাসনকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছিলেন। তরুণ সমাজের একটি অংশকে তার বরকন্দাজ বানানোর জন্য তাদের দুর্বৃত্ত বানিয়েছিলেন। তাদের চরিত্র নষ্ট করে দিয়েছেন। বিধিবাম, এতসব করেও অনেকটা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চাপের মুখে গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে একটি নির্বাচন দিতে হয়েছিল। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল ও তা ভোগ করা ছাড়াও ড. ইউনুস আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য এ দেশে উড়ে এসেছিলেন। শেখ হাসিনার অপরাধ, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিধিবদ্ধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘গ্রামীণ ব্যাংক’কে সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে তা পরিচালনা করার চেষ্টা করেছিলেন। ব্যাংকটি বহুদিন ধরে ড. ইউনুস তার নিজ স্বার্থে জবরদখল করে রেখেছিলেন আর পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছিলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে এই অঞ্চলের প্রায় সকল রাষ্ট্রকে তাদের করদ বা আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে রূপান্তর করার জন্য একটি নীলনকশা বাস্তবায়নে কয়েক দশক ধরে ব্যস্ত। তারা তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। পাকিস্তান, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও জাপানের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় থেকে মুক্ত নয়। এই দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতি সব সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা। প্রায় প্রত্যেকটিতেই তাদের সামরিক ঘাঁটি আছে। এই দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এখনো কিছুটা ব্যতিক্রম।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি সব সময় বাংলাদেশের দিকে তাক করা ছিল, কিন্তু এই দেশে তারা তেমন কোনো সুবিধা করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেও চেষ্টা করেছিল, পারেনি। এর ফলে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। এরপর আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, এই বিষয়ে তাদের চিন্তাধারাকে রুখে দিতে সমর্থ হয়েছে। তবে এবার তারা তাদের এই পরিকল্পনা ইউনুসের মাধ্যমে বাস্তবায়নে কিছুটা হলেও অগ্রসর হয়েছে। এই কাজে তারা তাদের বাছাই করা কিছু মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে অত্যন্ত সফলভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে। এদের মধ্যে আছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ড. আলী রিয়াজ, ইউনুসের নিরাপত্তা উপদেষ্টা (তারেক রহমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ড. খলিলুর রহমান, বাংলাদেশে থাকা ড. বদিউল আলম মজুমদার ও তার সংগঠন সুজন, চ্যানেল আই-এর জিল্লুর রহমান, সিপিডি, টিআইবি ইত্যাদি। এই সব কাজে সব সময় গণমাধ্যম শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। সম্প্রতি বিদেশের একটি গণমাধ্যমকে বাংলাদেশের স্বনামধন্য একটি পত্রিকার সম্পাদক সাক্ষাৎকার দিয়ে স্বীকার করেছেন, শেখ হাসিনার পতনে তার পত্রিকার বড় ভূমিকা ছিল। তারা যে কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরবর্তী সময়ে ড. ইউনুসের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন, তা বোঝার জন্য রকেট বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই।
২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান ড. ইউনুস ও সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের পৃষ্ঠপোষকতায় নায়কের বেশে দেশে আসেন। অথচ দেশে আসার কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি দেশের গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তার দেশে ফেরাটা তার একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। এর পরপরই তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ও দেশে ফেরার ঘটনা এটি মনে করিয়ে দেয় যে, মহলটির সিদ্ধান্তের ওপর তার দেশে ফেরাটা আটকে গিয়েছিল; তারা তাকে দেশে ফিরতে অনুমতি দিয়েছে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার অনুমতিটা শর্তসাপেক্ষে ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জনশ্রুতি, এই সব শর্তের মধ্যে আছে—তিনি দেশে একটি সুস্থধারার রাজনীতি চালু করবেন। কারণ বাংলাদেশে যে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি মিলে আনুমানিক আশি থেকে নব্বই শতাংশ মানুষের সমর্থন লাভ করে। বাকিদের দাবিদার বামপন্থি আর মৌলবাদী ভাবধারার সংগঠনগুলো। সুতরাং এই দুটি দলের কোনো একটিকে বাদ দিয়ে দেশের রাজনীতি চিন্তা করা সম্ভব নয়।
ইউনুস আওয়ামী লীগের শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তার পেশাগত জীবনে তিনি বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার আর শেখ হাসিনার কাছ থেকে যে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন, তা না পেলে তার পক্ষে হয়তো এত দূর আসা সম্ভব হতো না। দেশ স্বাধীন হলে ড. ইউনুস ফেরার পর প্রথম যে চাকরিটাতে যোগ দিয়েছিলেন, তা ছিল বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে, যা ছিল বঙ্গবন্ধুর বদান্যতার কারণে। গ্রামীণ ফোনের লাইসেন্সও শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে। অথচ ইউনুস ক্ষমতায় থাকার সময় আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি বাস্তবায়নের এক সাজানো নাটকে সায় দিয়ে এক নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশের জন্মদাতা দলটির কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন।
তারেক রহমান দেশে ফেরার আগে কাদের কাছে মুচলেকা দিয়ে দেশে ফিরেছিলেন, তা নিয়ে তিনি মুখ না খুললেও এটা পরিষ্কার যে তিনি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই মুচলেকা দিয়েছিলেন। এই ব্যাপারে ভারতের ভূমিকা বেশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, কারণ একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমান দেশে ফেরার কয়েক সপ্তাহ পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে আওয়ামী লীগবিহীন একটি সাজানো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে জামায়াত খুব বেশি আগ্রহী ছিল না, কারণ নির্বাচন ছাড়াই তারা দেশের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করছিল। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য—সব পদেই তাদের অথবা তাদের বি-টিম হিসেবে খ্যাত এনসিপির ক্যাডারদের দ্বারা ভরপুর। এমন অবস্থায় কেন তারা নির্বাচন চাইবে? বিএনপি তাদের অনেকটা তোয়াজ করেই নির্বাচনে নিয়ে আসে, তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা দিনের ভোট রাতে করে, যদিও আজ পর্যন্ত তা প্রমাণিত নয়। অথচ গত সংসদ নির্বাচনে ভোটের আগের দিন সন্ধ্যা হতেই ব্যালট পেপারে সিল মারা শুরু হয়েছিল, যা দেশের অনেক গণমাধ্যম প্রমাণসহ প্রচার করেছে। নির্বাচনের পর একটি সংসদ গঠিত হলো। সেই সংসদে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনপ্রাপ্তি নিশ্চিত করল। জামায়াতের জন্য আটষট্টিটি আসন ‘বরাদ্দ’ হলো। এটি ছিল জামায়াতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসনপ্রাপ্তি। একপর্যায়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেলে বিএনপি তাদের প্রার্থীর সাজানো পরাজয় নিশ্চিত করে জামায়াত নেতাকে ‘জয়ী’ করে।
ধারণা করা হয়েছিল, বিএনপি সরকার গঠন করার পর তারেক রহমান দেশে একটি সুস্থ রাজনীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। সামনে তার জন্য একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন অপেক্ষা করছে। সেই পথে না হেঁটে তিনি ইউনুসের জুতা পরে উল্টো পথে রওনা হয়েছেন। প্রথমেই তিনি যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিলেন, তা হচ্ছে ইউনুসের নেওয়া আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার নির্বাহী আদেশকে সংসদের মাধ্যমে আইনে পরিণত করা।
তারেক রহমানের সরকারের বয়স সাড়ে চার মাস। তার সরকারের সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষের পথে। এটি দেশের ত্রয়োদশ নির্বাচিত সংসদ। আশা করা গিয়েছিল, তারেক রহমান ও তার সরকার দেশে কিছুটা হলেও স্বস্তি ও সুশাসন ফিরিয়ে আনবেন। তেমন কিছুই আজ পর্যন্ত হয়নি।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকুন বা না থাকুন, ছায়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। সংসদ বা সংসদের বাইরে যখনই প্রধানমন্ত্রী কথা বলার জন্য মুখ খোলেন, প্রায়শই তিনি কিছুটা খেই হারিয়ে ফেলেন। এর জন্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না, কারণ রাজনীতি চর্চার তেমন একটা সুযোগ পাননি। তবে তিনি প্রতিবন্ধীদের বানানো চক্রযান চালনায় বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এরই মধ্যে তার আরও কিছু চটকদার কর্মকাণ্ড, যেমন—পায়ে হেঁটে রাস্তা পার হয়ে ওসমানী মিলনায়তনে যাওয়া, স্ত্রীকে পাশে বসিয়ে নিজে গাড়ি চালানো, বৃষ্টি হলে তার মাথার ওপর ছাতা ধরা ইত্যাদি মানুষের নজর কেড়েছে। সংসদে তার দলের বেশ কয়েকজন ঝানু রাজনৈতিক ব্যক্তি থাকলেও তাদের তেমন একটা কথা বলতে দেখা যায় না।
তারেক রহমানের সাড়ে চার মাসের সরকার পরিচালনার মেয়াদকালে দেশে সর্বক্ষেত্রে এক ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আর্থিকভাবে দেশ বর্তমানে অনেকটা দেওলিয়া। দলীয় ক্যাডারদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি, সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ, বিরোধী দল দমনের নামে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা, গুম, ক্যাঙ্গারু কোর্টে তাদের বিচারের নামে প্রহসন, কারাগারে নেতা-কর্মী হত্যাসহ কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না।
কদিন আগে আওয়ামী লীগের সাতজন কর্মীকে দলের হয়ে স্লোগান ও মিছিল করার ‘অপরাধে’ হত্যা করে তুরাগ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করলেও এই পর্যন্ত চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এখন সময় হয়েছে তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার—তিনি কি তার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করবেন, না আসন্ন কোনো রাজনৈতিক ঝড়ে উড়ে যাবেন? আর সামনে চলতে হলে ইউনুসের জুতা হতে পা বের করে নিজের জুতা পরে চলতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
১ জুলাই, ২০২৬

