বিএনপি’র নিজস্ব খুনোখুনি বেশি, ৫ মাসে ৫৯ রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত

বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিহত; নির্বাচন, আধিপত্য বিস্তার, দলীয় কোন্দল ও ব্যক্তিগত বিরোধকে দায়ী করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা: চলতি বছরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫৯ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ৪৫ জন, জামায়াতে ইসলামীর সাতজন এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাতজন নেতাকর্মী। এসব হত্যাকাণ্ডের বড় একটি অংশ ঘটেছে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংঘর্ষ, নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধ এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হত্যার পেছনে রয়েছে জমি, ব্যবসা, চাঁদাবাজি, পারিবারিক বিরোধ ও অন্যান্য ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। দৈনিক সমকালের এক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক প্রাণহাণীর এ চিত্র উঠে এসেছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৫৯টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৩০টি সরাসরি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পারস্পরিক বিরোধ, সংঘর্ষ বা হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ২৩ জন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের, পাঁচজন জামায়াতের এবং দুজন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।

এই ৩০টি হত্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ১৪টি ঘটনা ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে। আবার বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন। তাদের মধ্যে ছয়জন বিএনপি এবং পাঁচজন জামায়াতের নেতাকর্মী। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন পাঁচজন, যার মধ্যে তিনজন বিএনপি এবং দুজন আওয়ামী লীগের কর্মী।

অন্যদিকে, বাকি ২৯টি হত্যাকাণ্ড বিভিন্ন কারণে সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ২২ জন বিএনপির, পাঁচজন আওয়ামী লীগের এবং দুজন জামায়াতের নেতাকর্মী ছিলেন। এসব ঘটনার অন্তত ১৩টির পেছনে আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসায়িক বিরোধ, চাঁদা না দেওয়া, জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ওয়াজ-মাহফিলের অর্থের হিসাব, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ নানা কারণ চিহ্নিত করা গেছে। তবে বাকি ১৬টি হত্যার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

খুলনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি

রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পারস্পরিক বিরোধে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে খুলনা বিভাগে। সেখানে ১১ জন নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে নিহত হয়েছেন আটজন।

এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে পাঁচজন, ময়মনসিংহ বিভাগে তিনজন এবং চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুর বিভাগে একজন করে নিহত হয়েছেন।

হত্যার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৪ জনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পাঁচজন গুলিতে নিহত হয়েছেন। আর ১১ জনকে লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে, ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে বা কিল-ঘুষিতে হত্যা করা হয়েছে।

আহত দুই হাজার ৬৩৬ নেতাকর্মী

আসকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত রাজনৈতিক সংঘাতের ৩৪৭টি ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই হাজার ৬৩৬ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯৮০ জন আহত হয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭৪৫ জন। বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৭০ জন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১২৯ জন এবং বিএনপি ও এনসিপির সংঘর্ষে আহত হয়েছেন আরও ১০২ জন।

নির্বাচন ঘিরে প্রাণহানি

রাজনৈতিক বিরোধে সংঘটিত ৩০টি হত্যার মধ্যে সাতটি ঘটেছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে চারজন বিএনপি এবং তিনজন জামায়াতের নেতাকর্মী ছিলেন।

এর অন্যতম আলোচিত ঘটনা ঘটে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হাসাদহ বাজারে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন জামায়াতকর্মী হাফিজুর রহমান ও স্থানীয় বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মফিজুর রহমান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজনই মারা যান।

জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান শেখ জানান, সংসদ নির্বাচনের পরদিন হাসাদহ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসানকে প্রতিপক্ষ মারধর করেছিল। সেই ঘটনার জের ধরেই পরবর্তীতে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। তিনি বলেন, “এ ঘটনায় করা মামলায় মেহেদীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

নির্বাচন-পূর্ব সময়েও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। গত ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন বিএনপিকর্মী নজরুল ইসলাম। তিনি বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমরের সমর্থক ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের পর প্রতিপক্ষের হামলায় তিনি নিহত হন।

আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব

স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন বিএনপির সাতজন, জামায়াতের একজন এবং আওয়ামী লীগের একজন নেতাকর্মী।

এর মধ্যে গত ২১ মার্চ চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন তরুণ কর্মী শিমুল কাজী। ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি লাল খানের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষে তিনি প্রাণ হারান। ঘটনার আগে রক্তাক্ত অবস্থায় নাতিকে দেখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর দাদা নাজিম উদ্দিন কাজী।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় বিপুল পরিমাণ খাসজমির নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল।

রাজধানীতেও একই ধরনের বিরোধ প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। গত ৮ জুন মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় যুবদলের ২১ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা হয়েছে।

রমনা থানার ওসি মুহাম্মদ রাহাৎ খান বলেন, “পাঁচজন আসামিকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ থেকেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।”

ময়মনসিংহেও ২ জুন বিএনপিকর্মী রানা মিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। কোতোয়ালি থানার ওসি মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, “আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

বাগেরহাটেও রাজনৈতিক বিরোধের জেরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গত ৯ জুন রাতে ফকিরহাট উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় আহত হন স্থানীয় বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ মোড়ল। প্রাথমিক তদন্তে রাজনৈতিক বিরোধ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিএনপির স্থানীয় নেতারা এ ঘটনায় জামায়াতের কয়েকজন নেতাকে দায়ী করলেও তদন্ত এখনও চলমান।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে ১৫ জুন ঢাকা ও যশোরের অভয়নগর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়েও প্রাণহানি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরেও সহিংসতা থামেনি। গত ১০ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে যুবদলকর্মী সজিব চৌধুরী আকাশ নিখোঁজ হন। পরদিন একটি সবজি ক্ষেত থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই একটি বিরোধ ছিল। এ মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।” তদন্তে জানা যায়, স্থানীয় যুবদলের দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

ব্যক্তিগত বিরোধও হয়ে উঠেছে প্রাণঘাতী

রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও সব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংগঠনের কমিটি গঠন, পদ-পদবি নিয়ে বিরোধ, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি নির্বাচন, জলাশয়ের ইজারা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য, ধান কাটা, মাটি কাটা কিংবা খাসজমির দখল—এমন নানা বিষয় থেকেও সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। এসব ঘটনায় একাধিক রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন অপসারণকে কেন্দ্র করে বিরোধে জামায়াতের একজন নেতাকর্মী এবং রাজনৈতিক পূর্বশত্রুতার জেরে আওয়ামী লীগের একজন নেতাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

১৬ হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনও অজানা

রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ ছাড়াও বিভিন্ন ঘটনায় নিহত ২৯ জনের মধ্যে অন্তত ১৬টি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে যেসব ঘটনার কারণ চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আধিপত্য বিস্তার, ওয়াজ-মাহফিলের অর্থের হিসাব নিয়ে বিরোধ, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, জমি নিয়ে বিরোধ, ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং চাঁদা না দেওয়ার ঘটনা।

রাউজানে যুবদল নেতা হত্যায় নির্বাচনী পরিকল্পনার অভিযোগ

১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা মাকসুদুল হক। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ঘটনার পর র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) একজনকে গ্রেপ্তার করে।

র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, মাকসুদুল হক ভবিষ্যতে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই পরিকল্পনা ঠেকাতেই হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে।

রাউজান থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

একই সময়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের পাঁচ নেতাকর্মীও পৃথক ঘটনায় নিহত হন। এর মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব এবং অন্যান্য কারণে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পাশাপাশি জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুজন নেতাকর্মীও পৃথক ঘটনায় নিহত হন। তাদের একজনের হত্যার পেছনে গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক সহিংসতার বড় অংশের পেছনে রয়েছে দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের প্রবণতা।

তিনি বলেন, “অনেক সময় একই রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যেই স্বার্থ, পদ-পদবি কিংবা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মতো বিষয় নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধই একপর্যায়ে প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নেয়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করতে না পারলে রাজনৈতিক অপরাধও বন্ধ হবে না। তথ্য-প্রমাণ থাকলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকর সহযোগিতা করতে হবে, যাতে পুলিশ আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারে।

পুলিশ বলছে, সব হত্যাই রাজনৈতিক নয়

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত হলেই সেটিকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, “তদন্তে দেখা যায়, সব সময় রাজনৈতিক কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটে না। ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা অন্যান্য স্থানীয় কারণও অনেক ঘটনায় দায়ী থাকে। তুলনামূলকভাবে অল্প কয়েকটি ঘটনায় সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়।”

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সহিংসতার ধারাবাহিকতা

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যে রাজনৈতিক সহিংসতা এখন কেবল দল বনাম দলের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার এবং নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে সহিংসতার নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে সংঘাতের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও স্থানীয় বিরোধও প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles