রাজধানী ঢাকায় এক হিন্দু মন্দিরের পুরোহিতকে অপহরণ করে সারারাত আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে পুরান ঢাকার একটি সড়ক থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি ঘিরে রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী সুভাষ দেওরী (২৫) বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের অভিযোগ, একদল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাঁকে অপহরণ করে রাতভর আটকে রাখে। এ সময় তাঁকে মারধর, মানসিক নির্যাতন, বিবস্ত্র করা এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য জোরপূর্বক ফোন করানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, এটি শুধুই মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্যও ছিল। ভুক্তভোগীর ধর্মীয় পরিচয় এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সুভাষ দেওরী ঢাকা সেন্ট্রাল ল’ কলেজের শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরে সহকারী পুরোহিত হিসেবে নিয়মিত পূজা-অর্চনা করতেন এবং সেখান থেকে মাসিক সম্মানী পেতেন।
তাঁর গ্রামের বাড়ি মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায়। পড়াশোনার কারণে তিনি পুরান ঢাকার ওয়ারীর নারিন্দা এলাকায় এক বন্ধুর সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতেন।
রাতে বের হওয়ার পর থেকেই নিখোঁজ
সুভাষের রুমমেট দুর্জয় সাহা সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, সোমবার রাতে সুভাষ বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি।
তিনি বলেন, “সুভাষ আর আমি একই বাসায় থাকি। রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাসায় ফিরে দেখি ও নেই। ভেবেছিলাম কোনো কাজে বাইরে গেছে। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওর ফোন থেকে আমাকে কল করে কিছু টাকা পাঠাতে বলে। কিন্তু আমার কাছে টাকা না থাকায় পাঠাতে পারিনি।”
দুর্জয় আরও জানান, রাতে বন্ধুদের সঙ্গে ব্রাজিলের ফুটবল ম্যাচ দেখে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বাড়ি ফেরার সময় নারিন্দা রোডে অগ্রণী ব্যাংকের সামনে সুভাষকে রক্তাক্ত ও আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
“ওর মাথা, হাত ও পায়ে গুরুতর আঘাত ছিল। মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগও ছিল না। এরপর আমরা দ্রুত ওকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই।”
পরিবারের কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি
সুভাষের বড় বোন জয়া দেওরী জানান, রাত ১টার দিকে তাঁর ভাইয়ের মোবাইল ফোন থেকেই একটি কল আসে। ফোনে থাকা এক ব্যক্তি ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন।
তিনি ভয়েসকে বলেন, “রাত আড়াইটার দিকে আমার ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফোন করে বলেছিল, টাকা না দিলে ওরা তাকে মেরে ফেলবে। এরপর অপহরণকারীরা একটি ব্যাংক হিসাব নম্বর দেয়। অনেক কষ্টে ২৬ হাজার টাকা জোগাড় করে সেই হিসাবে পাঠাই। টাকা পাঠানোর পর আর ভাইয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি।”
পরিবারের অভিযোগ, টাকা পাওয়ার পরই দুর্বৃত্তরা সুভাষকে পুরান ঢাকার একটি সড়কে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
বিবস্ত্র করে নির্যাতন, ভিডিও ধারণেরও অভিযোগ
দুর্জয় সাহার ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে নেওয়ার পর সুভাষ তাঁকে জানিয়েছেন, রাত প্রায় ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত তাঁকে আটকে রাখা হয়।
এই সময় তাঁকে মারধর করা হয়, মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
সুভাষের দাবি, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাঁকে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা আনতে বাধ্য করা হয়।
বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করার সময় তাঁর মোবাইল ফোন, মানিব্যাগসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও খোয়া গিয়েছিল।
পুলিশ যা বলছে
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ ফারুক জানান, মঙ্গলবার সকাল প্রায় ৭টার দিকে সুভাষ দেওরীকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। তিনি এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অন্যদিকে, ওয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মফিজুর রহমান জানান, ঘটনাটি সম্পর্কে জানার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মামলার তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি।
ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু?
এখন পর্যন্ত তদন্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়নি, সুভাষ দেওরী তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হামলার শিকার হয়েছেন কি না।
তবে তিনি একজন হিন্দু পুরোহিত হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মুখপাত্র কাজল দেবনাথ ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেন, “ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছি। এটি শুধু ছিনতাই বা মুক্তিপণের ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, সেটিও আমরা খতিয়ে দেখছি।”
সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ
এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয় বলে মনে করছেন সংখ্যালঘু অধিকারকর্মীদের অনেকেই। তাঁদের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর একাধিক সহিংস ঘটনার অভিযোগ উঠেছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে, কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুস্কুল ইউনিয়নের একটি শিবকালী মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক ও পুরোহিত নয়ন সাধু নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর একটি পাহাড়ি এলাকায় গাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার আগে দুই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল।
একই মাসে কুষ্টিয়ায় আধ্যাত্মিক নেতা শামীম রেজা জাহাঙ্গীর গণপিটুনিতে নিহত হন। বহু বছর আগের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার পর শত শত মানুষের একটি উত্তেজিত জনতা তাঁর বাড়িতে হামলা চালায় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি জানায়।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ যাই হোক না কেন, প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। অন্যথায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও গভীর হতে পারে।
সুভাষ দেওরী এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর ওপর হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং এটি কেবল মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁর পরিবার, সহপাঠী ও শুভানুধ্যায়ীরা।

