হাতকড়া পরেই মায়ের জানাজায় অংশ নিলেন শাহ আলম, তিন ঘণ্টার প্যারোল

রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকে প্যারোলে মুক্তি; জানাজায় হাতকড়া পরিয়ে রাখার ঘটনায় নতুন বিতর্ক

ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ১ জুলাই: রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম খন্দকারকে মায়ের শেষ বিদায়ে সামিল হওয়ার জন্য তিন ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে মায়ের জানাজায় পুলিশের কড়া পাহারা ও হাতকড়া পরা অবস্থায় তাঁর উপস্থিতি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একজন বন্দিকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হলেও এমন শোকাবহ মুহূর্তে হাতকড়া পরিয়ে রাখা কতটা মানবিক।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টার জন্য তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশের পাহারায় তাঁকে আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের নূরপুর লামারবাড়ি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিকেল পৌনে ৩টার দিকে নূরপুর পূর্বপাড়া জামে মসজিদ মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় তিনি অংশ নেন।

জানাজা শেষে তাঁর মা হালিমা বেগমকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই শাহ আলমকে আবারও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

কারাগারে ছেলেকে দেখতে গিয়েই অসুস্থ হন মা

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক একটি মামলায় শাহ আলম খন্দকার বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

কয়েক দিন আগে ছেলেকে দেখতে কারাগারে গিয়েছিলেন তাঁর মা হালিমা বেগম (৭৫)। পরিবারের দাবি, সেই সফরের পরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।

মায়ের মৃত্যুর পর শেষবারের মতো তাঁকে দেখার এবং জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে পরিবারের পক্ষ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্যারোলের আবেদন করা হয়।

সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এহসান মুরাদ মানবিক বিবেচনায় মঙ্গলবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টার প্যারোল মঞ্জুর করেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের জেলার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের জন্য শাহ আলমকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় এবং সময় শেষ হওয়ার পর তাঁকে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

হাতকড়া পরা অবস্থায় জানাজায় অংশগ্রহণ

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শাহ আলম খন্দকারকে পুরো সময় হাতকড়া পরা অবস্থায় রাখা হয়। তাঁর চারপাশে পুলিশের একটি নিরাপত্তা বলয় ছিল। জানাজা, দাফন ও স্বজনদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সময় কাটানোর পুরো সময় তিনি পুলিশের নিবিড় পাহারায় ছিলেন।

নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানালেও, জানাজায় হাতকড়া পরিয়ে রাখার বিষয়টি এলাকাবাসীর মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়।

“মায়ের সেবা করতে পারিনি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট”

জানাজা শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের কাছে মায়ের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া চান শাহ আলম খন্দকার। এ সময় তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমি আমার মায়ের সেবা করতে পারিনি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। কয়েক দিন আগে মা আমাকে কারাগারে দেখতে এসেছিলেন। এরপর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তবে আল্লাহর রহমতে অন্তত মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এজন্য মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।”

উপস্থিত অনেকেই এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের ভাষ্য, স্বজন হারানোর বেদনায় বিধ্বস্ত শাহ আলমকে শেষ বিদায়ের মুহূর্তেও শিকলবন্দি অবস্থায় দেখতে অনেকেরই কষ্ট হয়েছে।

পুলিশ যা বলছে

আখাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাভেদুল ইসলাম বলেন, “আদালতের নির্দেশে শাহ আলম খন্দকারকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। জানাজা শেষে পুলিশি পাহারায় তাঁকে পুনরায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”

তবে জানাজার সময় তাঁকে কেন হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছিল—এ বিষয়ে পুলিশ আলাদাভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

প্যারোল কী এবং কীভাবে দেওয়া হয়

বাংলাদেশে বিশেষ মানবিক পরিস্থিতিতে কারাবন্দিদের সীমিত সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। সাধারণত নিকটাত্মীয়ের মৃত্যু, গুরুতর অসুস্থতা বা বিশেষ পারিবারিক প্রয়োজনে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে এ ধরনের প্যারোল মঞ্জুর করা হয়।

প্যারোলে মুক্তি পেলেও বন্দি আইনগতভাবে রাষ্ট্রের হেফাজতেই থাকেন। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁকে পুলিশি পাহারায় রাখা হয় এবং নির্ধারিত সময় শেষে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

তবে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি শোকাবহ পারিবারিক মুহূর্তে বন্দির মানবিক মর্যাদার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তাঁদের মতে, নিরাপত্তা ঝুঁকি না থাকলে হাতকড়ার মতো দৃশ্যমান শৃঙ্খল ব্যবহার পরিহার করা উচিত।

বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

শাহ আলম খন্দকার আখাউড়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হয়েছে এবং তাঁদের অনেকেই এখনো কারাগারে রয়েছেন।

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিবার এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বলছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে অনেক নেতা-কর্মীকে মামলায় জড়িয়ে আটক রাখা হয়েছে এবং তাঁদের ক্ষেত্রে মানবিক বিষয়গুলোও অনেক সময় যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

এই প্রেক্ষাপটে শাহ আলম খন্দকারের মায়ের জানাজায় হাতকড়া পরা অবস্থায় উপস্থিতির ঘটনাটি আবারও বন্দিদের মানবিক অধিকার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles