ভাঙ্গুড়ায় গ্রেপ্তারের দুই ঘণ্টার মধ্যেই মুক্তি পেলেন যুবলীগ নেতা

ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে দুই শতাধিক গ্রামবাসীর থানায় বিক্ষোভ; প্রমাণ না পাওয়ায় মুচলেকায় মুক্তি, জানাল পুলিশ

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় গ্রেপ্তারের মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই মুক্তি পেয়েছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা রিপন সরকার। তাকে মুক্তির দাবিতে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের এক নেতার নেতৃত্বে দুই শতাধিক গ্রামবাসী থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করলে পুলিশ আলোচনায় বসে এবং পরে তাকে ছেড়ে দেয়।

শুক্রবার (৩ জুলাই) সন্ধ্যায় পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পার-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি রিপন সরকারকে তার নিজ গ্রাম থেকে নাশকতার একটি ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে ভাঙ্গুড়া থানা পুলিশ। পরে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হলে স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে জড়ো হয়ে তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন।

একুশে টেলিভিশন ও এখন টিভির খবরে বলা হয়, রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভাঙ্গুড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম সোহেলের নেতৃত্বে দুই শতাধিক গ্রামবাসী থানার সামনে অবস্থান নেন। তারা রিপন সরকারের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রথমে বিক্ষোভকারীদের থানা চত্বর থেকে সরিয়ে দেয়। পরে ছাত্রদল নেতা শফিকুল ইসলাম সোহেল এবং গ্রামের কয়েকজন প্রবীণকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)-এর কক্ষে আলোচনার জন্য ডাকা হয়। বৈঠক শেষে রাত সাড়ে ১০টার দিকে রিপন সরকারকে মুক্তি দেওয়া হয়।

ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ যিনি আটক হয়েছিলেন তিনি আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের নেতা, আর তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্রদলের একজন নেতা। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা স্থানীয় বাস্তবতা ও গ্রামীণ সামাজিক সম্পর্কের একটি ভিন্ন চিত্রও সামনে এনেছে, যেখানে অনেক সময় দলীয় পরিচয়ের চেয়ে স্থানীয় স্বার্থ ও সামাজিক সম্পর্ক বেশি প্রাধান্য পায়।

‘গ্রামের স্বার্থে এসেছি’

বিক্ষোভের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ছাত্রদল নেতা শফিকুল ইসলাম সোহেল বলেন, বিষয়টির পেছনে রয়েছে একটি খাসজমির বাজারকে ঘিরে স্থানীয় বিরোধ।

তিনি ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের গ্রামের স্বার্থে খাসজমির ওপর একটি বাজার বসানো হয়েছে। এ নিয়ে গ্রামে রাজনীতি চলছে। একজন বিশেষ ব্যক্তির স্বার্থে রিপন সরকারকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। তাই গ্রামের মানুষকে নিয়ে আমরা থানায় এসেছি।”

‘প্রমাণ না পাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে’

ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাক্যুল আজম জানান, রিপন সরকারকে কেবল সন্দেহভাজন হিসেবে থানায় আনা হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে কোনো সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পর স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “রিপন সরকার ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। নাশকতার একটি ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে থানায় আনা হয়েছিল। কিন্তু প্রাথমিক যাচাইয়ে তার সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই মুচলেকা নিয়ে তাকে গ্রামবাসীর জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, রিপন সরকারের বিরুদ্ধে তাকে আটক রাখার মতো পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে যে নাশকতার অভিযোগে তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তদন্ত চলমান রয়েছে কি না, সে বিষয়েও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ঘটনা

ভাঙ্গুড়ার এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম এখনো নিষিদ্ধ রয়েছে।

গত ২২ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে সম্ভাব্য কর্মসূচি ঠেকাতে ঢাকা ও দেশের আরও পাঁচটি জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়। সে সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে, কারণ সরকারের তথ্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা বিভিন্ন জেলায় “মিছিল-মিটিংয়ের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।”

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ক্ষমতা ব্যবহার করে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রকাশনা ও অনলাইন কার্যক্রম সীমিত করা হয় এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযানও বাড়ানো হয়। বর্তমান বিএনপি সরকারও সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল—উভয় সংস্থাই বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং রাজনৈতিক সংগঠন করার স্বাধীনতার ওপর চলমান বিধিনিষেধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলোর মতে, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক বিধিনিষেধ আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যদিও ভাঙ্গুড়ার ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই রিপন সরকারের মুক্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে, তবু এটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে প্রমাণের মানদণ্ড, পুলিশের নিরপেক্ষতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রশ্নকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

এখন পর্যন্ত রিপন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের ঘোষণা দেয়নি পুলিশ। ফলে তাকে ঘিরে তদন্তের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে স্থানীয়ভাবে ঘটনাটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles