যুক্তরাষ্ট্রে ‘বাংলা কেন্দ্র’ আয়োজিত বইমেলার উদ্বোধন

‘বাংলা ভাষাই আমার প্রকৃত দেশ’—তসলিমা নাসরিন

‘বিশ্বজুড়ে বাংলা বই’ প্রতিপাদ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের বেথেসডায় ২৬ ও ২৭ জুন দুই দিনব্যাপী বইমেলার আয়োজন করেছে বাংলা কেন্দ্র। প্রবাসী বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে সাহিত্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক সংযোগ আরও জোরদার করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

শুক্রবার (২৬ জুন) সন্ধ্যায় মেলার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশি-সুইডিশ লেখক, নারীবাদী ও মানবাধিকারকর্মী তসলিমা নাসরিন। ফিতা কেটে ও প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে তিনি মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে তসলিমা নাসরিন বলেন, “আমার জীবনে রাষ্ট্র বদলেছে, ভূগোল বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে। কিন্তু যেখানেই থাকি, বাংলা ভাষাই আমার একমাত্র আশ্রয়, আমার একমাত্র দেশ। রাষ্ট্র মানুষকে নির্বাসিত করতে পারলেও ভাষা থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।”

তিনি বলেন, “আমি বাংলাতেই ভাবি, বাংলাতেই স্বপ্ন দেখি এবং বাংলাতেই প্রতিবাদ করি। ইউরোপে এক দশক থাকার পর ভাষার টানেই আমি পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানেও আমাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। তবুও আমার লড়াই থেমে নেই। আমি লিখে চলেছি মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এবং নারীর অধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতার পক্ষে। কারণ লেখাই আমার শ্বাস নেওয়া, লেখাই আমার বেঁচে থাকা।”

প্রযুক্তির আধিপত্যে বই পড়ার সংস্কৃতি কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আজ মোবাইলের স্ক্রিন বইয়ের পাতা কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ গভীর পাঠ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই সময়ে প্রবাসে বইমেলার আয়োজন এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এটি শেকড় হারানোর বিরুদ্ধে এবং ভাষাহীন হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ লড়াই।”

নতুন প্রজন্মের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আমাদের সন্তানরা যদি বাংলা পড়তে না শেখে, তবে তারা শুধু একটি ভাষাই হারাবে না; হারাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দের মতো মনীষীদের বিশাল মানবিক উত্তরাধিকার। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষাই মানুষের আত্মপরিচয় গড়ে তোলে।”

প্রবাসী আয়োজকদের উদ্যোগকে ‘ঐতিহাসিক কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করে তসলিমা নাসরিন বলেন, “বই মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। যে সমাজ বই পড়ে না, সেই সমাজ দ্রুত গুজব, কুসংস্কার ও স্বৈরাচারের হাতে বন্দি হয়ে যায়। তাই বইমেলা আসলে সভ্যতার মেলা।”

মেলা প্রাঙ্গণে মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া ও ওয়াশিংটন ডিসিসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আসা প্রবাসী বাঙালি ও বইপ্রেমীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা কেন্দ্র জানায়, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পৌঁছে দেওয়াই এ বইমেলার প্রধান উদ্দেশ্য।

দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে বই বিক্রির পাশাপাশি লেখক-পাঠক আড্ডা, বই পরিচিতি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles