ভারতের আশ্রয়ে থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফিরবেন। তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি কার্যক্রম, রাজনৈতিক নির্বাসন এবং আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তিনি এই প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দেন।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়; বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সাংবিধানিক অধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজন থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় প্রকৃত বিচার নয়; বরং এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে সাজানো হয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নির্বাসিত জীবন
২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং দলটির বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের হয়।
এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন, এসব পদক্ষেপের পরও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। তার মতে, দলটির শিকড় দেশের জনগণের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে দলটিকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রশাসন ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করছে এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে।
তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর যে কোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনাকেই আঘাত করে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় রাষ্ট্রের আরও কার্যকর ভূমিকা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
‘অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ জিতবে’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, যদি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ পুনরায় জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে সক্ষম হবে।
তিনি আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে কোনো গোপন সমঝোতার আলোচনা চলছে—এমন খবরও নাকচ করে দেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপট
শেখ হাসিনার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা পর্যায়ে আলোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ, দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
‘জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান’
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাসন থেকেই তার রাজনৈতিক সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। তিনি বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে জনগণের শক্তির ওপর ভর করেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।
তার ভাষায়, জনগণের সমর্থনই শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

