ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

কারাকাস, ২৫ জুন — পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ভবন ধসে পড়েছে, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের সন্ধানে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে, তবে কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা লাখে পৌঁছাতে পারে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলার পশ্চিমাঞ্চলে প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার এবং তার কিছুক্ষণ পরই ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সংঘটিত এই দুটি ভূমিকম্পের কম্পন রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অনুভূত হয়।

ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল, সেনাবাহিনী, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দিনরাত কাজ করছেন। তবে অব্যাহত আফটারশক উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

বাড়ছে মৃত ও আহতের সংখ্যা

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং আহত হয়েছেন ৯৭১ জনের বেশি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দুর্গত অনেক অঞ্চলের সঙ্গে এখনও পুরোপুরি যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি, ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।

জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, “অনেক এলাকা থেকে এখনও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং মৃত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।”

দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অসংখ্য মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। বহু আবাসিক ভবন, অফিস ভবন এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

হাজারো মৃত্যুর আশঙ্কা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে ইউএসজিএসের প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন থেকে। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনায় চূড়ান্ত মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে জনবহুল এলাকায় বহুতল ভবন ধসে পড়ার কারণে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরপর দুটি বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ায় অনেক ভবন প্রথম কম্পনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দ্বিতীয় কম্পনে পুরোপুরি ধসে পড়ে। এ কারণেই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে গেছে।

বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারাকাস ও লা গুয়াইরা

রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন আবাসিক ভবন, সরকারি স্থাপনা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের সময় মানুষ আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। অনেকেই রাতভর খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করেছেন, কারণ তারা নতুন করে আফটারশকের আশঙ্কা করছেন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর একাধিক এলাকায় পরিবারগুলো ধসে পড়া ভবনের সামনে অপেক্ষা করছে, যদি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা তাদের স্বজনদের জীবিত উদ্ধার করা যায়।

শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ভেনেজুয়েলায় গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি। ১৯০০ সালের সান নার্সিসো ভূমিকম্পের পর এত বড় মাত্রার কম্পন দেশটিতে খুব কমই দেখা গেছে।

ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, দুটি বড় ভূমিকম্পের মধ্যকার সময়ের ব্যবধান ছিল অত্যন্ত কম। এ ধরনের ঘটনাকে ‘সিসমিক ডাবলেট’ বলা হয়, যেখানে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পবিদদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি সাধারণত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনে।

আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তাব

দুর্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ভেনেজুয়েলাকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বিবৃতিতে বলেন, “ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তাতে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। ভারত সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”

ইউরোপীয় ইউনিয়ন জরুরি স্যাটেলাইট মানচিত্রায়ন কর্মসূচি চালু করেছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দ্রুত শনাক্ত করে উদ্ধারকাজে সহায়তা দেওয়া যায়। জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে।

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

বিদ্যমান সংকটের মধ্যে নতুন বিপর্যয়

দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলা অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবিক সমস্যার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে এসেছে যে, দুর্বল অবকাঠামো ও সীমিত সরকারি সক্ষমতা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। অনেক হাসপাতাল ইতোমধ্যে রোগীতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। কিছু এলাকায় চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

দেশটির প্রধান বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বিভিন্ন সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা পরীক্ষা চলছে। স্কুল, কলেজ এবং অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবনের খোঁজ

ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন শহরে এখনও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন উদ্ধারকর্মীরা। বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের শব্দ শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে যত বেশি মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে, তত বেশি প্রাণ বাঁচানো যাবে।

তবে আফটারশক অব্যাহত থাকায় উদ্ধারকর্মীদের জন্য ঝুঁকিও বাড়ছে। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ভবন এখনও দাঁড়িয়ে থাকলেও যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার লাখো মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। স্বজন হারানোর শোক, নিখোঁজদের খোঁজ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই দেশটি তার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করছে।

spot_img