প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় পর্যটন ভিসা চালু

২৮ জুন থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দিল নয়াদিল্লি

ঢাকা, ২৫ জুন — প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আবারও পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দিয়েছে ভারত। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নেওয়া এ সিদ্ধান্তের ফলে আগামী ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিরা আবার ভারত ভ্রমণের জন্য পর্যটন ভিসার আবেদন করতে পারবেন।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন ঢাকায় ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এর আগে তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমরা পর্যটন ভিসার জন্য স্বাভাবিক ভিসা আবেদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু করছি। আগামী ২৮ জুন থেকে আবেদন জমা দেওয়া যাবে। মানবিক বিবেচনায় জরুরি ক্ষেত্রে মেডিকেল ভিসা সুবিধা অব্যাহত থাকবে।”

তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনায় অবস্থিত ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করা হবে। পরে ধাপে ধাপে অন্যান্য শহরেও এ সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “আমরা আশা করি, ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়ার ফলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।”

দীর্ঘ বিরতির অবসান

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ওই সময় ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস এবং বিভিন্ন ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রের সামনে একাধিকবার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে ভারত কয়েক দিনের জন্য সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করে।

পরবর্তীতে ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলো সীমিত পরিসরে চালু হলেও ভারত স্পষ্ট করে জানায় যে, মেডিকেল ভিসা এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণির ভিসা আপাতত ইস্যু করা হবে না। ফলে পর্যটন, পারিবারিক সফর, ব্যবসায়িক ভ্রমণ কিংবা শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে ভারত যেতে আগ্রহী হাজারো বাংলাদেশি দীর্ঘ সময় ধরে ভিসা জটিলতার মুখে পড়েন।

দুই বছরের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন চিকিৎসাপ্রত্যাশী রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। যদিও মেডিকেল ভিসা চালু ছিল, তবুও অন্যান্য সহায়ক ভিসা সীমিত থাকায় অনেকের যাতায়াত পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং পর্যটকদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়।

বাংলাদেশিদের কাছে ভারতের গুরুত্ব

বাংলাদেশিদের জন্য ভারত দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম জনপ্রিয় বিদেশ ভ্রমণ গন্তব্য। চিকিৎসা, কেনাকাটা, শিক্ষা, ব্যবসা, ধর্মীয় পর্যটন এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে যান।

কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি ও হায়দরাবাদ বিশেষ করে বাংলাদেশি রোগী ও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। ভিসা নিষেধাজ্ঞার আগে বাংলাদেশ ছিল ভারতের জন্য অন্যতম বৃহৎ বিদেশি পর্যটক উৎস দেশ।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ যত বাড়ে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও তত দৃঢ় হয়। সেই বিবেচনায় পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে।

নতুন হাইকমিশনারের আগমনের পর গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা

দীনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাঁর এই ঘোষণা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে আসার সময়ও তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে এবং জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা এমন একটি পদক্ষেপ, যার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে পড়বে। রাজনৈতিক সম্পর্কের উত্থান-পতনের মধ্যেও দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত?

গত প্রায় দুই বছরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং আঞ্চলিক নানা ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হওয়া সব সমস্যার সমাধান নয়। তবে এটি এমন একটি বাস্তব পদক্ষেপ, যা দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে পরিবার, চিকিৎসা, শিক্ষা বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের জন্য এ ঘোষণা স্বস্তির খবর হিসেবে এসেছে।

আগামী ২৮ জুন থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হলে প্রায় দুই বছর পর আবারও বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসার দুয়ার উন্মুক্ত হবে। এখন দেখার বিষয়, এই পদক্ষেপ দুই দেশের বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের পথ কতটা প্রশস্ত করে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles