গ্রেপ্তারের একদিনেরও কম সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে যুবলীগ নেতা নুরুল আলমের মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের দাবি, তাকে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আলম বুধবার সকালে মারা যান। কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তার মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল, যখন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, কারাগারে আটকাবস্থা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। ফলে নুরুল আলমের মৃত্যু রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু
কারা সূত্র জানায়, মঙ্গলবার নুরুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে সাতকানিয়া থানার ২০২৪ সালের একটি বিস্ফোরক আইনের মামলায় আসামি করা হয় এবং সেদিনই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মো. ইকবাল হোসেন জানান, বুধবার সকালে নুরুল আলম শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথার কথা জানান। এরপর তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
তিনি বলেন, “দ্রুত তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”
ইকবাল হোসেন আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকেরা ধারণা করছেন নুরুল আলমের ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’ হয়েছিল। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, মঙ্গলবার বিকেলে নুরুল আলমকে কারাগারে আনার সময় তিনি সুস্থ ছিলেন। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্নও ছিল না। রাতেও তিনি কোনো শারীরিক সমস্যার কথা জানাননি।
নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন বলেন, কারাগারে আনার সময় তার শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং অসুস্থ হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
‘সুস্থ মানুষকে মৃত অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হলো’
তবে কারা কর্তৃপক্ষের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ নুরুল আলমের পরিবার।
তার বড় ভাই নূর মোহাম্মদ দাবি করেন, নুরুল আলমের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো মামলা ছিল না এবং স্থানীয় বিরোধের জেরে তাকে টার্গেট করা হয়েছে।
তিনি দ্য ভয়েসকে বলেন, “ওর বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করত, নিয়মিত রেয়াজউদ্দিন বাজারের দোকানে বসত।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের জায়গা-জমি নিয়ে কিছু প্রভাবশালী লোকের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের কারণেই তাকে টার্গেট করে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে।”
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভূমি-সংক্রান্ত একটি শুনানিতে অংশ নিতে গেলে সাতকানিয়া এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) নুরুল আলমকে আটক করে। পরে তাকে থানার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হয়।
স্বজনদের দাবি, কারাগারে নেওয়ার সময় তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। অথচ পরদিন সকালে তার মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়।
নূর মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, “সন্ধ্যায় যখন তাকে কারাগারে নেওয়া হচ্ছিল তখনও সে সুস্থ ছিল। সকালে হঠাৎ মৃত্যুর খবর পেলাম। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।”
তিনি নুরুল আলমকে ‘হত্যা করা হয়েছে’ বলে দাবি করে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।
পুলিশের বক্তব্য
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি জানান, গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল নুরুল আলমকে থানায় নিয়ে আসে। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হয় এবং আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়।
ওসির দাবি, থানায় অবস্থানকালে নুরুল আলম সুস্থ ছিলেন এবং তাকে কোনো ধরনের মারধর করা হয়নি।
তবে গ্রেপ্তারের সঙ্গে জড়িত গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
নুরুল আলমের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সমর্থক ও নেতা-কর্মীদের অনেকে ঘটনাটিকে সন্দেহজনক হেফাজতে মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এটি আরেকটি ‘কাস্টডিয়াল ডেথ’ বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা, যা স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারি মহল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
নুরুল আলমের মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল, যখন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের কারণে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই কারাগার, পুলিশ হেফাজত ও অন্যান্য আটককেন্দ্রে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
বাংলাদেশের অন্যতম মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে অব্যাহত হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা উচিত। কারণ গ্রেপ্তারের পর একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা ও চিকিৎসার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়।
নুরুল আলমের মৃত্যুর ঘটনা এর আগে আটক থাকা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মীর মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে তুলনা টানার সুযোগ তৈরি করেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ অসুস্থতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতন, অবহেলা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের অনেক ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ রয়ে গেছে।
উত্তরহীন প্রশ্ন
নুরুল আলমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। গ্রেপ্তারের সময় কিংবা কারাগারে প্রবেশের পর তার শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তিনি একটি মামলার আসামি ছিলেন এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
ফলে নুরুল আলমের মৃত্যু ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের ফলাফল এবং সম্ভাব্য তদন্তের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ, গ্রেপ্তার অভিযান এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে এই মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে এবং এমন মৃত্যুর ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি না।

