রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ধানমন্ডি ৩২ এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর একটি বিক্ষোভ মিছিল থেকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত তিনজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন, যার মধ্যে একজন গুরুতর আহত বলে জানা গেছে। ঘটনাটি দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য রাজনৈতিক কর্মসূচি, আকস্মিক মিছিল বা নাশকতার আশঙ্কায় রাজধানীজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ১৮ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি মাঠে অবস্থান নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
ধানমন্ডি ৩২-এ উত্তেজনা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ধানমন্ডি ৩২ এলাকায় আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের প্রতিবাদে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে জামায়াতে ইসলামী। মিছিল শেষে সংগঠনের নেতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে সাংবাদিকদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন দৈনিক সকালের মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদক মাহফুজুর রহমান শিশির। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাকে ঘিরে ধরে মারধর করা হয়। এতে তার মুখমণ্ডল ও মুখগহ্বরে আঘাত লাগে। পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
এ ছাড়া কালবেলা পত্রিকার প্রতিবেদক আব্দুর রহমান ইশান এবং যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক রাব্বি সিদ্দিকও হামলায় আহত হন। অন্য সাংবাদিকরা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত আরও কয়েকজন সাংবাদিক অভিযোগ করেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা হেনস্তা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, একাধিক সংবাদকর্মীকে শারীরিক ও মৌখিকভাবে নিগ্রহ করা হয়েছে।
মিছিলে জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান, মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন, আনিসুজ্জামান ও জাহিনুর রহমানসহ আরও অনেকে অংশ নেন বলে জানা গেছে।
হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ জামায়াতের
ঘটনার পর বিভিন্ন মহলে সমালোচনার মুখে হামলাকে ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ধানমন্ডি থানা জামায়াতের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান খান সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ও ‘দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করেন। ঘটনার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
এদিকে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি জনগণের তথ্য জানার অধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল।
ডিএমপি আগেই জানিয়েছিল, ২৩ জুন উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি ২০০টিরও বেশি চেকপোস্ট, পিকেট ও নজরদারি পয়েন্ট স্থাপন করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্য নাশকতা, সহিংসতা কিংবা রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গত ১৯ জুন মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস. এন. মো. নজরুল ইসলাম বলেন,
“২৩ জুনকে ঘিরে কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকির তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় ডিএমপি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।”
এর আগে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বহু নেতা-কর্মীকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সোমবার পুলিশ জানায়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ২৬ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের পক্ষে কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সেনাবাহিনী ও বিজিবির মোতায়েন
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার রাজধানীসহ কয়েকটি জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি বিজিবিকেও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “তারা বিভিন্ন জেলায় মিছিল-মিটিংয়ের মাধ্যমে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় ৩০ জুন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর সদস্যরা বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করবেন।
রাজধানীর প্রবেশপথ, সরকারি স্থাপনা এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
সাংবাদিকদের ওপর এই হামলার ঘটনা দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মাঠপর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
গণমাধ্যম পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল-মিটিং কিংবা সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকরা প্রায়ই ঝুঁকির মুখে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মী, উত্তেজিত জনতা কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আচরণেরও শিকার হতে হয় তাদের।
মঙ্গলবারের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পরিবেশে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের কী ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়।
রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের একটি। দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে এ বছর রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ উত্তেজনা দেখা গেছে।
একদিকে সম্ভাব্য কর্মসূচি ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন, অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন পাল্টা কর্মসূচি পালন করছে।
সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করলেও ধানমন্ডি ৩২-এর সহিংসতার ঘটনা রাজধানীর রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যদের টহল অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে উসকানিমূলক কার্যকলাপের ওপরও বাড়তি নজরদারি চালানো হচ্ছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

