আওয়ামী লীগ ঠেকাতে সেনা মোতায়েন

মিছিল, গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তা জোরদারের মধ্যে রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে নতুন প্রশ্ন

ঢাকা, ২২ জুন — আওয়ামী লীগের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও চট্টগ্রামে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার অংশ হিসেবে এই সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে এক সপ্তাহের জন্য সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করবে সেনাবাহিনী। সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সম্ভাব্য বেআইনি সমাবেশ, আকস্মিক মিছিল, রাজনৈতিক শোডাউন ও নাশকতার আশঙ্কা বিবেচনায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-২ থেকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের কাছে পাঠানো চিঠিতে সেনা মোতায়েনের অনুরোধ জানানো হয়। উপসচিব কে এম ইয়াসির আরাফাতের সই করা ওই চিঠিতে বলা হয়, যেসব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাদের পক্ষ থেকে সভা-সমাবেশ, মিছিল বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা হলে তা সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। এতে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়া, প্রাণহানি এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পদের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের মিছিল-সমাবেশ করতে দেখা গেছে। এতে আমাদের ধারণা হয়েছে, তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।”

তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন হলে সরকার বিজিবি বা সেনাবাহিনীর সহায়তা নেবে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে সেনাসদস্যদের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

সরকারের দাবি, এই ব্যবস্থা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে এত বড় পরিসরের নিরাপত্তা প্রস্তুতি দেশের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতাকেই সামনে আনছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত একটি বড় রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে কার্যত বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।

দেশজুড়ে পুলিশের সতর্কতা

সেনা মোতায়েনের আগে ১৮ জুন পুলিশ সদর দপ্তর সারা দেশের পুলিশ ইউনিটগুলোকে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠায়। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলটির নেতাকর্মীরা স্থানীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন, আকস্মিক মিছিল বা সমাবেশের চেষ্টা করতে পারেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়, এসব কর্মসূচিকে ঘিরে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দিলে আওয়ামী লীগ-সমর্থকরা পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে যেতে পারেন বলেও সতর্ক করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশও রাজধানীতে বড় ধরনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২৩ জুন রাজধানীজুড়ে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড়, প্রবেশপথ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় ২০০টির বেশি চেকপোস্ট ও পিকেট বসানো হবে।

ডিবি, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট, স্পেশাল ব্রাঞ্চ এবং ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন মাঠে থাকবে। গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হবে। চারটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণকক্ষে অতিরিক্ত রিজার্ভ ফোর্সও রাখা হচ্ছে।

শুক্রবার ঢাকার মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “২৩ জুন একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।”

তিনি আরও জানান, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট থাকবে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট হামলার আশঙ্কার কথা জানাননি।

ঢাকা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল

কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নজরদারির মধ্যেও আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ঢাকা ও বিভিন্ন জেলায় ঝটিকা মিছিল করেছেন। এসব মিছিলকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্ভাব্য অস্থিরতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের কাছে এগুলো দলীয় অস্তিত্ব ও সাংগঠনিক উপস্থিতির বার্তা।

রোববার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কলেজ গেট এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আকস্মিক মিছিল বের করেন। পুলিশ দ্রুত সেখানে অভিযান চালিয়ে অন্তত ১০ জনকে আটক করে।

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী রফিক আহমেদ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে বলেন, “সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কলেজ গেট এলাকায় আকস্মিক মিছিল বের করার সময় আমরা তাদের আটক করি।”

আটকদের মধ্যে সাজীব সরদার, মো. নাজির হোসেন, মো. কবির, কালাম ফারাজী, আলী রাজ হোসেন, মো. কবির হোসেন, মো. স্বপন, মো. সিরাজ, হেলাল হোসেন ও আসাদ উদ্দিনের নাম জানা গেছে।

একই দিনে গাজীপুরে যুবলীগের ব্যানারে আরেকটি মিছিল হয়। গাজীপুর সিটি যুবলীগের নামে বের হওয়া ওই মিছিল ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কলম্বিয়া গার্মেন্টসের কাছে অনুষ্ঠিত হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অংশগ্রহণকারীদের আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার বহন করতে দেখা যায়। তারা দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।

ভিডিওতে পুলিশের দিকে হুঁশিয়ারিমূলক স্লোগান দেওয়ার দৃশ্যও দেখা যায়। বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ পরে জানান, পুলিশ ভিডিওটি দেখেছে এবং সেটি ওই দিনের নাকি আগের কোনো ঘটনার, তা যাচাই করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামেও চলতি মাসের শুরুতে জিইসি মোড় এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মীর একটি ঝটিকা মিছিলের খবর পাওয়া যায়। ভিডিওতে অংশগ্রহণকারীদের “জয় বাংলা” এবং “শেখ হাসিনা ফিরে আসবে” স্লোগান দিতে দেখা যায়। পুলিশ জানায়, মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিলেটেও ১৬ জুন আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী নবাব রোড এলাকায় মিছিল করেন। তারা “জয় বাংলা” স্লোগান দেন এবং দলীয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, “রাজনৈতিক বন্দিদের” মুক্তি এবং “মিথ্যা মামলা” প্রত্যাহারের দাবি জানান।

এসব মিছিল বড় আকারের না হলেও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এগুলো দেখাচ্ছে যে কঠোর প্রশাসনিক চাপে থাকলেও আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়নি। একই সঙ্গে সরকার এগুলোকে সম্ভাব্য অস্থিরতা, সংঘর্ষ বা নাশকতার ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।

বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় গ্রেপ্তার অভিযান

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হয়েছে।

বরিশালে শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার বিশেষ অভিযানে ৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করে মহানগর পুলিশ। স্থানীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১৯ জন নেতা, কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন।

গ্রেপ্তারদের মধ্যে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নূর উদ্দিন শাহিন, কোষাধ্যক্ষ তৌহিদুল ইসলাম এবং সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর জয়নাল আবেদীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এই অভিযানে বরিশাল মহানগর পুলিশের চারটি থানা ও গোয়েন্দা শাখা অংশ নেয়। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম শনিবার বলেন, নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান চলবে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য দিতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।

পুলিশের ভাষ্য, এসব অভিযান আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য। তবে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে এমন ব্যাপক অভিযান রাজনৈতিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

ইতিহাসের দল, বর্তমানের নিষেধাজ্ঞা

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন, পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে। শুরুতে দলটির নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনার অংশ হিসেবে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। দলটি ধীরে ধীরে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক সংগঠন, ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রে উঠে আসে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। ফলে দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু একটি রাজনৈতিক দলের দিন নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক জাতীয় রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গেও তা গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এই প্রেক্ষাপটে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং নির্বাচনী নিবন্ধন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।

১২ মে ২০২৫ রাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার পর নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারার একটিকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে বাইরে রাখা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সহিংসতা ও মৃত্যুর ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকায় এই ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, নির্দিষ্ট অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে পারে; তবে পুরো একটি রাজনৈতিক ধারাকে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পরিসর সংকুচিত করে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক গ্রেপ্তারের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২৩ মে ২০২৫ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছে, এই নিষেধাজ্ঞা সরকারের মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, “এই সিদ্ধান্ত সরকারের সংগঠনের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।”

অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, একটি রাজনৈতিক দলের ওপর সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা এবং নিবন্ধন স্থগিতের মতো পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের কঠোর শর্ত পূরণ করে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার হাজার হাজার সন্দেহভাজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটক করেছে এবং ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটক—যা আগের সরকার আমলেও গুরুতর সমস্যা ছিল—পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থেকেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসও বাংলাদেশ নিয়ে ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক পরিবেশের ভঙ্গুরতা, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন প্রশাসনিকভাবে সুশৃঙ্খল হলেও আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন কতটা পূর্ণাঙ্গভাবে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে, তা নিয়ে কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন।

এই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণগুলো জুন ২৩-কে ঘিরে নিরাপত্তা প্রস্তুতিকে একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দাঁড় করায়। বিষয়টি এখন আর শুধু একটি মিছিল বা একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের প্রশ্ন নয়। বরং এটি হয়ে উঠেছে—বাংলাদেশ কি আইনশৃঙ্খলা, জবাবদিহি, বিচার এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারবে কি না—সেই পরীক্ষার অংশ।

আইনশৃঙ্খলা বনাম রাজনৈতিক অধিকার

সরকারের দায়িত্ব হলো সহিংসতা ঠেকানো, নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং নাশকতার যে কোনো চেষ্টা প্রতিরোধ করা। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে হুমকি, সংঘর্ষের উস্কানি বা বোমাবাজির অভিযোগকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

তবে একই সঙ্গে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক কর্মসূচি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা। দলীয় পতাকা উত্তোলন, স্লোগান, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন বা শান্তিপূর্ণ মিছিল—এসবকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখলে গণতান্ত্রিক পরিসর আরও সংকুচিত হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে বিরোধী দল দমনের অভিযোগ একাধিক সরকারের বিরুদ্ধে উঠেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালেও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর চাপ, মামলা ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ ছিল। বর্তমান সরকারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো—তারা কি সেই পুরনো চক্র ভাঙবে, নাকি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একই রকম দমননীতিকে নতুনভাবে ব্যবহার করবে।

২৩ জুন ঘিরে ঢাকা ও কয়েকটি জেলা এখন কঠোর নিরাপত্তার আওতায়। সেনা টহল, পুলিশের চেকপোস্ট, গোয়েন্দা নজরদারি এবং গ্রেপ্তার অভিযান হয়তো তাৎক্ষণিক সংঘাত ঠেকাতে পারে। কিন্তু এগুলো রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়।

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই এবার শুধু একটি দলের স্মারক দিন হিসেবে আসছে না। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, আইনের শাসন এবং নাগরিক স্বাধীনতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে সামনে এসেছে।

সরকার যদি সত্যিই স্থিতিশীলতা চায়, তবে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তাও দিতে হবে। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে গেলে তা সাময়িক শান্তি আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে।

spot_img