প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে প্রতিবেদন করায় আটক সাংবাদিক রেজানুরের মুক্তি দাবি

পেন বাংলাদেশ, সম্পাদক পরিষদ ও জেএমবিএফের নিন্দা; সাইবার মামলায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

ঢাকা, ২১ জুন — স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের জেরে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠন।

পেন বাংলাদেশ, সম্পাদক পরিষদ এবং ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) এই গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে রেজানুর ইসলামের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে। একই সঙ্গে সংগঠনগুলো মামলার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ পর্যালোচনা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুন বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুর সদর উপজেলার গাছা ইউনিয়নের বোর্ড বাজার এলাকা থেকে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ১৯ জুন শুক্রবার তাকে বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের নির্দেশে তাকে বগুড়া কারাগারে পাঠানো হয়।

রেজানুর ইসলাম দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন ঘিরে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মীর শাহে আলম বগুড়া-২, শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য।

গত ১৫ জুন বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ এবং দ্য নিউ নেশন পত্রিকার উত্তরবঙ্গ প্রতিনিধি তানভীর আলম রিমন মামলাটি করেন। অভিযোগে বলা হয়, প্রকাশিত প্রতিবেদনটি মিথ্যা, মানহানিকর এবং প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, ১২ জুন বগুড়া প্রেস ক্লাবে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী যে বক্তব্য দেন, তা বিকৃত করে সংবাদ প্রকাশ করা হয় এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি বগুড়া সদর থানায় এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। এতে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ধারা ছাড়াও মানহানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মামলায় দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর ছয় সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন পত্রিকাটির প্রকাশক ও সম্পাদক মেহেদী হাসান, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রেজানুর ইসলাম, বার্তা সম্পাদক আশরাফ আলী ফারুকী, প্রতিবেদক সালেহ কায়সার ও শামসুল আলম শামস এবং বগুড়া প্রতিনিধি সাব্বির হাসান।

অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। প্রকাশিত প্রতিবেদন, বাদীপক্ষের অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতের বিচারাধীন বিষয়।

২০ জুন শনিবার পেন বাংলাদেশের অফিস সেক্রেটারি জাহিদ সোহাগ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে রেজানুর ইসলামের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানানো হয়। সংগঠনটি বলেছে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুসন্ধান করা এবং তা প্রকাশ করা বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির মৌলিক অংশ।

পেন বাংলাদেশ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, “জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুসন্ধান ও তা প্রকাশের অধিকার হলো বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির মৌলিক অংশ।”

সংগঠনটি আরও বলেছে, সংবাদ প্রকাশের জেরে রুটিন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রবণতা দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করতে পারে।

পেন বাংলাদেশের মতে, মানহানি বা সুনামের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং ফৌজদারি আইনের এমন ব্যবহার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংগঠনটি বলেছে, এই ধরনের পদক্ষেপ মুক্ত প্রকাশের আন্তর্জাতিক নীতিমালার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

সংগঠনটি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতা মেনে মামলার দ্রুত, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

রেজানুর ইসলামের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদও। ২০ জুন প্রকাশিত বিবৃতিতে পরিষদ বলেছে, ঘটনাটি বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক। পরিষদের মতে, কোনো সংবাদ নিয়ে আপত্তি থাকলে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ করার সুযোগ আছে। প্রচলিত আইনি পথও খোলা রয়েছে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো গ্রহণযোগ্য নয়।

সম্পাদক পরিষদ বলেছে, “কোনো সংবাদে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তিনি প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ করতে পারেন অথবা প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া ব্যবহার না করে একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।”

পরিষদ রেজানুর ইসলামের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছে। একই সঙ্গে সংবাদসংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার ও কারাবাসের বদলে পেশাগত ও আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সও ২১ জুন প্যারিস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে রেজানুর ইসলামের গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

সংগঠনটি বলেছে, সাইবার নিরাপত্তা আইন বা অন্য কোনো আইন কখনো স্বাধীন সাংবাদিকতা দমন, সমালোচনামূলক প্রতিবেদন বন্ধ করা বা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হতে পারে না। বাংলাদেশের সরকারের সংবিধানসম্মত এবং আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করার।

জেএমবিএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহানুর ইসলাম বলেন, “আগের সরকারের মতোই নতুন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা আইন ব্যবহারের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। এটি গভীর উদ্বেগজনক।”

তিনি আরও বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শক্তিশালী হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। “কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই প্রত্যাশাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার,” বলেন তিনি।

জেএমবিএফ রেজানুর ইসলামের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি, মামলায় অভিযুক্ত অন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সব ধরনের হয়রানি বন্ধ, মামলার দ্রুত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ দমনমূলক আইনের অপব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

সংগঠনটি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সংস্থা এবং কূটনৈতিক মহলকে এই মামলা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে।

জেএমবিএফ বলেছে, “স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়; বরং এটি জবাবদিহি, সুশাসন এবং মানবাধিকার সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি।”

বাংলাদেশে সাইবার ও ডিজিটাল আইন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। পরে আইনটি বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়। তবে অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, আইন পরিবর্তন হলেও অস্পষ্ট ধারা, গ্রেপ্তারক্ষমতা এবং দুর্বল জবাবদিহির কারণে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অধিকার সংগঠনগুলোও বাংলাদেশের সাইবার আইনি কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, অস্পষ্ট ভাষা ও দুর্বল বিচারিক তদারকি থাকলে এসব আইন সাংবাদিকতা ও নাগরিক মতপ্রকাশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংগঠন আগেও বলেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কিংবা পরে প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো আইন নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়, মৌলিক অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। তাদের মতে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন মামলা ক্ষমতার জবাবদিহি দুর্বল করে এবং জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

রেজানুর ইসলামের মামলাটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ এটি একজন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি কোনো প্রতিবেদনে সংক্ষুব্ধ হলে তার জবাব দেওয়ার অধিকার রয়েছে। সংশোধনী, প্রতিবাদলিপি, প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ বা দেওয়ানি প্রতিকার চাওয়ার পথও খোলা। কিন্তু তদন্তাধীন বা বিতর্কিত একটি প্রতিবেদনের জেরে সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা সংবাদমাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সাংবাদিকরা এ ধরনের মামলায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন। ঢাকার বাইরে সাংবাদিকদের অনেক সময় স্থানীয় রাজনীতি, প্রশাসন, পুলিশ, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। ফলে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর যদি দ্রুত ফৌজদারি মামলা ও গ্রেপ্তার হয়, তাহলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ গণমাধ্যমের স্বাভাবিক কাজ। এসব বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা উচিত। কিন্তু গ্রেপ্তার, কারাবাস ও ফৌজদারি মামলার মাধ্যমে সাংবাদিকদের চাপের মুখে ফেলা হলে তা জনগণের জানার অধিকারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এখন পর্যন্ত সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে রেজানুর ইসলামের মামলার বিষয়ে কোনো বিশেষ পর্যালোচনার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পক্ষ থেকেও কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

রেজানুর ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। মামলায় নাম থাকা অন্য সাংবাদিকরাও আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, এই মামলার পরিণতি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাইবার আইনের ব্যবহার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

spot_img