প্রথম সফরেই চীন: তারেক রহমান কি ভারতের বার্তা শুনছেন?

নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর বেইজিংয়ে। এই সিদ্ধান্ত কি কেবল অর্থনৈতিক, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় কোনো কৌশলগত বার্তার ইঙ্গিত?

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর চীন। কূটনৈতিক ক্যালেন্ডারে এটি হয়তো একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ভূরাজনীতির অভিধানে এটি মোটেও সাধারণ কোনো ঘটনা নয়।

বিশ্বের বহু দেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য অনেক সময়ই প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। সেই সফর দিয়ে নতুন নেতৃত্ব তার অগ্রাধিকার, কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বার্তা তুলে ধরে। দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক রীতি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটি বহুবার দেখা গেছে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—ভারতকে পাশ কাটিয়ে প্রথম সফরের জন্য চীনকে বেছে নেওয়া কি কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, নাকি এর ভেতরে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা রয়েছে?

প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন ওয়াশিংটনও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়নের শুনানিতে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করা এবং বাংলাদেশকে বেইজিংয়ের কৌশলগত বলয়ের মধ্যে চলে যাওয়া থেকে বিরত রাখা তার অগ্রাধিকারগুলোর একটি হবে। একজন মনোনীত রাষ্ট্রদূতের মুখে এমন বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসেবে দেখছে না; বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

সেই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর যদি হয় বেইজিং, তবে ওয়াশিংটনের অস্বস্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারতের প্রতিক্রিয়া।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকার বদলাতে পারে, দল বদলাতে পারে, এমনকি পররাষ্ট্রনীতির ভাষাও বদলাতে পারে। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলায় না। বাংলাদেশের তিন দিক জুড়ে ভারত। স্থলপথ, নদী, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, সীমান্ত, আঞ্চলিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই ভারতের ভূমিকা এমনভাবে জড়িত যে, দিল্লিকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশের মোট স্থলসীমান্তের প্রায় পুরোটা ভারতের সঙ্গে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি কেন্দ্রবিন্দু। বিদ্যুৎ আমদানির বড় অংশ আসে ভারত থেকে। বহু নদীর উৎস ভারতের ভূখণ্ডে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সন্ত্রাসবাদ দমন পর্যন্ত অসংখ্য বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতা অপরিহার্য।

অর্থাৎ ভারত বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি প্রতিবেশী নয়; একটি অনিবার্য বাস্তবতা।

চীন অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে বিনিয়োগ চাইবে, প্রযুক্তি চাইবে, বাজার চাইবে—এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু বাংলাদেশের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ কখনোই চীনকে বেছে নেওয়া নয়। চ্যালেঞ্জ হলো চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে গিয়ে ভারতকে বিচ্ছিন্ন না করা।

ইতিহাস বলে, দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো দেশই ভারতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে টেকসই কৌশলগত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ—সব দেশই কোনো না কোনো সময়ে চীনের দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সবাইকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হয়েছে। কারণ ভৌগোলিক বাস্তবতা অর্থনীতির মতোই শক্তিশালী।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা ভিন্ন নয়।

দস্তগীর জাহাঙ্গীর

এখানে আরেকটি রাজনৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করেছে যে শেখ হাসিনা সরকার ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল ছিল। এখন যদি নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথম বড় কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে চীনকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে সেটি কি একটি বিপরীত মেরুর নীতি হয়ে দাঁড়াচ্ছে? অর্থাৎ এক ধরনের ভারসাম্যহীনতার জায়গা থেকে আরেক ধরনের ভারসাম্যহীনতার দিকে যাত্রা?

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কিন্তু কোনো পরাশক্তির সঙ্গে আবেগনির্ভর সম্পর্ক চায় না। বাংলাদেশকে দরকার বাস্তববাদী সম্পর্ক—ভারতের সঙ্গে, চীনের সঙ্গে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও।

কিন্তু সেই বাস্তববাদ শুরু হতে হবে একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করার মধ্য দিয়ে: ভারতকে উপেক্ষা করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

তিস্তার পানি সমস্যা থাকতে পারে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ থাকতে পারে। বাণিজ্য বৈষম্য নিয়ে অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু এসব সমস্যার সমাধানও শেষ পর্যন্ত ভারতের সঙ্গেই আলোচনার টেবিলে বসে খুঁজতে হবে। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তিস্তার পানি এনে দেবে না। বেইজিং সীমান্ত সমস্যার সমাধান করবে না। বাংলাদেশের ভূগোল পরিবর্তন করার ক্ষমতা কোনো পরাশক্তির নেই।

এ কারণেই তারেক রহমান সরকারের সামনে মূল প্রশ্নটি চীন সফর নয়; বরং চীন সফরের পর কী হয়।

ঢাকা কি দিল্লিকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করবে? ভারত কি এই সফরকে কেবল অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখবে, নাকি কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করবে? যুক্তরাষ্ট্র কি এটিকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে নেবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও মেলেনি।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফর শুধু বেইজিংয়ের জন্য বার্তা নয়; দিল্লি, ওয়াশিংটন এবং পুরো অঞ্চলের জন্যও একটি রাজনৈতিক সংকেত।

তারেক রহমান হয়তো চীন থেকে বিনিয়োগ, ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে ফিরবেন। সেটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু সেই সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে অন্য জায়গায়—তিনি কি একই সঙ্গে ভারতের আস্থা ধরে রাখতে পারবেন?

কারণ অর্থনৈতিক অংশীদার নির্বাচন করা যায়, কিন্তু প্রতিবেশী নির্বাচন করা যায় না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই।

লেখক: দস্তগীর জাগাঙ্গীর, সম্পাদক, দি ভয়েস

spot_img