প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগে আওয়ামী লীগ ঘিরে অভিযান, অধিকার লংঘন

বরিশালে ২৪ ঘণ্টায় ৭৭ জন গ্রেপ্তার; ২৩ জুন ঘিরে সারা দেশে সতর্ক পুলিশ

আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযান জোরদার করেছে পুলিশ। আগামী ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই বরিশালে ২৪ ঘণ্টার অভিযানে ৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে বরিশাল মহানগর পুলিশ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত বরিশাল মহানগর পুলিশের চারটি থানা ও গোয়েন্দা শাখা যৌথভাবে এ অভিযান চালায়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১৯ জন নেতা, কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন।

গ্রেপ্তারদের মধ্যে রয়েছেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নূর উদ্দিন শাহীন, কোষাধ্যক্ষ তৌহিদুল ইসলাম এবং সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর জয়নাল আবেদীন।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম বলেন, নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে।

শনিবার তিনি বলেন, “নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

তিনি আরও জানান, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান চলবে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার জন্য তিনি নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

বরিশালের এ অভিযান এমন সময়ে হলো, যখন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সারা দেশে পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ১৮ জুনের এক নির্দেশনায় বলা হয়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলীয় পতাকা উত্তোলন, মিছিল বা অন্যান্য কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করতে পারেন। এসব কর্মসূচি ঘিরে জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশও রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদারের কথা জানিয়েছে। শুক্রবার মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার, ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস, এস এন মো. নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “২৩ জুন একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।”

তিনি আরও জানান, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট ও নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। পরে দলটি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের রাজনৈতিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।

২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।

এই নিষেধাজ্ঞার পরিধি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৫ সালের ২৩ মে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই পদক্ষেপের বৈধতা ও আনুপাতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সংগঠনটি জানায়, এ সিদ্ধান্ত সরকারের সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমের ওপর এমন স্বেচ্ছাচারী সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা এবং নিবন্ধন স্থগিতের সিদ্ধান্ত কঠোর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড পূরণ করে না।

গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ-সম্পৃক্ত কর্মকাণ্ড ঘিরে পুলিশের অভিযান দেখা গেছে। সংক্ষিপ্ত মিছিল, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রস্তুতি, সহযোগী সংগঠনের সমাবেশ বা নিষিদ্ধ দলের ব্যানারে কর্মসূচি আয়োজনের অভিযোগে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের খবর এসেছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, নেত্রকোনা, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। ১৩ জুন নেত্রকোনায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উদ্যোগে আকস্মিক মিছিলের অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ছয় স্থানীয় নেতাকর্মীকে কারাগারে পাঠানো হয়।

পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক পালাবদলের পর আইনের শাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মূল্যায়নও উদ্ধৃত করা হয়। সেখানে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের নির্বিচারে আটক করেছে এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের অভিযান জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতেই আইন প্রয়োগ করা উচিত।

২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, বড় শহর ও সংবেদনশীল এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকবে। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, জনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, সমাবেশের অধিকার এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

spot_img