অবিনাশী আওয়ামী লীগের জন্য শুভকামনা

নিষেধাজ্ঞা, হত্যা, কারাবরণ ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আওয়ামী লীগ আবারও স্বমহিমায় ফিরে আসবে; জনগণের শক্তিই দলটির সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

২৩শে জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। উপমহাদেশের এটি একমাত্র দল, যে দলটি ১৯৭১ সালে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করেছিল। আর কী নির্মম বাস্তবতা, সেই দলটি বর্তমানে তাদের সৃষ্ট দেশে প্রকাশ্যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারছে না, কারণ সরকার তা নিষিদ্ধ করে রেখেছে। আর নিষিদ্ধের অপকর্মটি করেছেন শান্তি ফেরিওয়ালা পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি ড. মুহাম্মদ ইউনুস, যিনি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে বর্গির মতো রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। ইউনুসের অপকর্মের ভার এখন তারেক রহমান স্বেচ্ছায় বহন করছে। এই ভার তার জন্য হয়তো খুব বেশি ভারী হয়ে যেতে পারে। দুই পক্ষের মধ্যে একটি অভিন্ন মিল আছে। উভয়ই আওয়ামী লীগকে অন্তর থেকে অপছন্দ করে।

আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল হতে ২০২৪-এর জুলাই পর্যন্ত দেশটি শাসন করেছেন। তার আগে ১৯৯৬ সাল হতে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ও তার দল রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ট ছিলেন। ২০২৪ সালে একটি ভয়াবহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি আর দল আজ ক্ষমতাচ্যুত। তিনি এখন ভারতে নির্বাসিত। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী হয় কারাগারে, বা দেশছাড়া। আওয়ামী লীগের বা শেখ হাসিনার জীবনে এমনসব ঘটনা নতুন নয়। যখন এমন পরিস্থিতি থেকে দল বা নেতৃত্ব ফিরেছে, তখন দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয় বলে অনেকে মনে করেন।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (জন্মকালে আওয়ামী মুসলিম লীগ) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী অধিকাংশ রাজনীতিবিদই ভারতকে স্বাধীন করার জন্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে রাজনৈতিক জীবন শুরু করা জিন্নাহ একটি চতুর চালের মাধ্যমে ঢাকায় জন্ম নেওয়া মুসলিম লীগের নেতৃত্ব ছিনতাই করেন এবং এটিকে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি জানানোর মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ তখনো রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দুটিই ছিল উচ্চবিত্তের ক্লাবসম সংগঠন।

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারত ভাগ (পড়ুন বাংলা ও পাঞ্জাব) হয়ে সৃষ্টি হয় ‘স্বাধীন’ পাকিস্তান ও হিন্দুস্থান। যে বাঙালিদের ত্যাগ আর নেতৃত্বের কারণে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল, সেই বাঙালিরা বছর না ঘুরতেই হয়ে গেল পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ও পশ্চিম পাকিস্তানের শোষক শ্রেণির শোষণের ক্ষেত্র। এই শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে জন্ম নিয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। শুরুতে মাওলানা ভাসানীকে দলের সভাপতি এবং টাঙ্গাইলের তরুণ ছাত্রনেতা শামসুল হককে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তখন যুবক শেখ মুজিব কারাগারে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকে যে ক’জন ছাত্রনেতা কারাভোগ করেছেন, তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু অন্যতম।

১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করে। এই দলটি পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব সময় প্রতিবাদ করতে পেরেছে বা করে এসেছে, গণমানুষের স্বার্থের জন্য রাজপথে বা সংসদে লড়াই করে তা ছিনিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের ত্যাগ আর যোগ্য নেতৃত্বের কারণে তারা সব সময় তাদের লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছে।

অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনামলে আওয়ামী লীগ দুইবার ক্ষমতায় ছিল। একবার কেন্দ্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রীত্বে (জোট সরকার, ১৯৫৬-৫৭) এবং অন্যবার ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্টের প্রধান দল হিসেবে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের বেসামরিক-সামরিক আমলাতন্ত্রের ষড়যন্ত্রের কারণে আওয়ামী লীগ-শাসিত সরকারের শাসন স্বল্পস্থায়ী ছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারে থাকুক বা না থাকুক, দলটির কাছে ক্ষমতার রাজনীতি কখনও রাজনীতি করার মূল লক্ষ্য ছিল না। আওয়ামী লীগ সর্বদা জনগণের প্রকৃত অধিকারের জন্য লড়াই করেছে। এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, শেখ মুজিব, পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা, অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের মধ্যে প্রায় তেরো বছর (ঠিক ৪,৬৮২ দিন) কারাগারে কাটিয়েছেন এবং অন্তত দুইবার মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। একবার ১৯৬৯ সালে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রহসনমূলক বিচারের সময় এবং দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। উভয় ক্ষেত্রেই সামরিক আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয় এবং এই কথিত ‘অপরাধের’ একমাত্র শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। উভয় ক্ষেত্রেই দেশের আপামর জনগণই মুজিবকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এবং তাঁকে একজন সাধারণ রাজনৈতিক নেতা থেকে শুধু জাতির পিতাই নয়, বরং বিশ্বমাপের একজন রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছিল।

১৯৭৫ সালের আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও ১৯৮১ সালে জীবনবাজি রেখে দেশে ফিরেছিলেন। দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে তাঁর দল সরকার গঠন করেছিল। আবার ২০০৮ সালে সরকার গঠন করে এবং ২০২৪ সালে ৫ম বারের মতো সরকার গঠন করে বাংলাদেশকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। পরিবর্তন করে দিয়েছিল দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য। একটি স্বল্পোন্নত দেশ পরিণত হয়েছিল উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। ঠিক তখন আঘাত হানে দেশের ভেতরের ও বাইরের একদল ষড়যন্ত্রকারী। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ এখন অনেকটা কঙ্কালসার। কিছুদিনের মধ্যে লাইফ সাপোর্টে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। শেখ হাসিনা দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করতে গিয়ে ঊনিশবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট একটি দলীয় সমাবেশে সভাপতিত্ব করার সময় তাঁকে গ্রেনেড ছুঁড়ে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যারা এই অপকর্মের জন্য দায়ী ছিল এবং আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দণ্ডিত হয়েছিল, তারা আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ট। কেউ কেউ সরকারের শীর্ষ পদে।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি এই দেশে কখনো খুব কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। জেনারেল আইয়ুব খান, জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল জিয়াউর রহমান দলটিকে একাধিকবার নিষিদ্ধ করেছেন। সর্বশেষ ড. ইউনুস। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকে ১৯৭৫ সালে জেলের ভেতর হত্যা করা হয়েছে। একই বছরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আওয়ামী লীগ তার সাতাত্তর বছরের ইতিহাসে একাধিকবার বিভাজনের শিকার হয়েছে। শেষমেষ জনগণের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের কাছেই ফিরে এসেছে।

শত প্রতিকূলতার মাঝেও বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে সব অন্ধকার ভেদ করে আবার স্বমহিমায় ফিরবে, এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা। এই দলের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, পঁচাত্তরে যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের সকলের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। আজকের এই দিনে দলের সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

জয় বাংলা।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ২০ জুন ২০২৬।

spot_img