তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টা তার উদ্দেশ্যে হাসিলে কামিয়াব

দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে ভারতবিরোধী অবস্থানকে জোরালো করা হলেও দেশের ক্রমাবনতিশীল বাস্তবতায় ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগান তার অর্থ হারিয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডাঃ জাহেদুর রহমান সম্প্রতি যে উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে গিয়ে শিরোনাম হয়েছেন তা তিনি হতেই চেয়েছিলেন। তিনি তার উদ্দেশ্যে সফল হয়েছেন। ডাঃ জাহেদুর রহমানরা কোন কাঁচা কাজ করেন না বলেই তাদের অনেকেই এখন সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ট। ভারতের রাজধানী দিল্লি অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা আর ঘটনার স্বাক্ষী। দিল্লি গিয়েছেন আর হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগাহে যান নি তেমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। প্রতি সন্ধ্যায় কাওয়ালির অসাধারণ আসর বসে। বাইরে ভারত বিখ্যাত ‘কারিমস্’ এর কাবাব পাওয়া যায়। নিজামুদ্দিন আউলিয়া সম্পর্কে অনেক প্রবাদ আছে। দিল্লির সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুগলক বাংলা জয় করে দিল্লি ফিরছেন। তিনি নিজামুদ্দিন পীরকে একদম পছন্দ করেন না। ঠিক করেছেন এবার দিল্লি ফিরে তিনি তাঁকে এক হাত দেখে নেবেন। তুগলক দিল্লির কাছাকাছি। অনেকে তার ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। সকলে নিজামুদ্দিনকে গিয়ে বললেন ‘হুজুর পালান। সুলতানের ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে’। জবাবে নিজামুদ্দিন বললেন ‘হনুজ দিল্লি দুরস্ত’, ‘বৎস দিল্লি অনেক দূর’। কথিত আছে দিল্লি পৌঁছানোর আগেই সুলতানের মৃত্যু হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ডাঃ জাহেদের জন্য কি দিল্লি অনেক দূর হয়ে গেল ? হয়তো তার জন্য শুধু দিল্লিই অনেক দূর হয় নি, অনেক গন্তব্যই হয়তোবা তার জন্য এখন দূর হয়ে যাবে। সেই আলোচনায় পরে আসছি।

দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য সমূদ্র বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা হয়ে ডাঃ রহমানের ভারতের রাজধানী যাওয়া। তার সাথে আরো দু’জন সরকারি প্রতিনিধি ছিলেন। একজন অতিরিক্ত সচিব অন্যজন সহকারী সচিব। ডাঃ রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রীকে তথ্য ও সম্প্রচার বিষয় ছাড়াও দেশ পরিচালনায় ভবিষ্যৎ কৌশল, নীতি প্রণয়ন ও অন্যান্য নানাবিধ কৌশল সম্পর্কে উপদেশ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও তিনি প্র্যাক্টিস করেন না। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দেশের একটি বহুল পরিচিত ও প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে তিনি নিয়মিত কলাম লিখতেন। পত্রিকাটি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কথিত আছে এটি ছিল ডিপ স্টেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মূখপত্র। তারেক রহমানের দীর্ঘ আঠার বছর প্রবাস জীবনকালে ডাঃ রহমান তার সাথে সব সময় যোগাযোগ রেখেছেন, পরামর্শ নিয়েছেন। তিনি ছিলেন তারেক রহমানের লন্ডন কেবিনেটের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী এই কেবিনেটের কথার বাইরে এক চুলও নড়েন না বলে বাজারে কথা চাওড় আছে।

ডাঃ জাহেদুর রহমানের আর একটি বড় পরিচয় হচ্ছে তিনি দেশের অন্যতম মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। প্রায় প্রতি রাতে তাকে কোন না কোন টিভি চ্যানেলে দেখা যেত দেশের রাজনীতির বিষয়ে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে কথা বলতে। তবে তার আলোচনার মূল বিষয় ছিল শেখ হাসিনা, তার বিগত শাসনকাল আর প্রচন্ড ভারত বিরোধিতা। তথাকথিত ‘জুলাই আন্দোলন’ শুরু হলে তিনি সেই ‘আন্দোলনের একজন বড় মূখপাত্র আর ঝান্ডাধারি হয়ে উঠলেন। ২০২৩ সাল থেকে অবিরাম কথা বলার জন্য চালু করলেন নিজস্ব ইউটিউভ চ্যানেল। নাম জাহেদ’স টেক’। সেই চ্যানেলে লাগামহীন ভাবে চললো ভারত বিরোধী প্রচারণা। তার সেই চ্যানেল সহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি চ্যানেল ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেই দেশে প্রচার নিষিদ্ধ হয়ে গেল।

দেশের মানুষের জন্য তিন ধরণের পাসপোর্ট আছে। প্রথমটি সবুজ রঙের সাধারণ, দ্বিতীয়টি সরকারি, হাল্কা নীল আর তৃতীয়টি লাল। এই পাসপোর্ট কারা পাবেন তা আইন ধারা নির্ধারিত। ডাঃ রহমানের মতো এমন রাষ্ট্রিয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি লাল পাসপোর্ট, যাকে বলে ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্ট তা প্রাপ্য। এই পাসপোর্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বহন করেন। হতে পারেন তিনি একজন সংসদ সদস্য বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এই পাসপোর্ট নিয়ে কেউ দেশের বাইরে গেলে দেশের বিভিন্ন সংস্থাকে অবহিত করতে হয়। যেই দেশে এই পাসপোর্ট নিয়ে একজন যাবেন সেই দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসকে অবহিত করা হয় যাতে ভ্রমণকারি সেই দেশে যানবাহনের সুবিধা, প্রটোকল এবং প্রয়োজনে অন্যান্য সুবিধা পান। প্রত্যেক দূতাবাসে এই সব ব্যবস্থা করার জন্য পৃথক দপ্তর আর জনবল আছে। তবে লাল পাসপোর্ট থাকলেই যে একজন ব্যক্তি যেকোন দেশে প্রবেশ করতে পারবেন তার নিশ্চয়তা নেই। সেটি নির্ভর করে প্রত্যেক দেশের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার উপর। ডাঃ রহমান বর্তমান সরকারের চার মাসেও এই সুবিধা কেন গ্রহণ করেনি তা বোধগম্য নয়। এমনও হতে পারে তার দুটি পাসপোর্ট আছে, যা একটি ফৌজদারি অপরাধ। পাসপোর্ট জটিলতা ও বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, সৈয়দ আবুল হোসেনকে ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে মন্ত্রীত্ব হারাতে হয়েছিল। তিনি নিজের লাল পাসপোর্ট ব্যবহার না করে সবুজ পাসপোর্টে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন।

ডাঃ রহমান যে পাসপোর্টে দিল্লি গিয়ে সংবাদ পত্রের শিরোনাম হলেন সেটি ছিল সবুজ পাসপোর্ট। তাতে সার্ক স্টিকার, যা সাধারণত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সহ আরো কিছু নির্বাচিত পেশার মানুষকে দেয়া হয় তা ছিল। এই স্টিকার থাকলে সার্ক দেশ সমূহে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করা যায়, যদি না কোন দেশ সেই ভিসা গ্রহণ করতে অসম্মতি জানায়। ডাঃ রহমানের পাসপোর্ট ও সার্ক স্টিকার বেশ পূরানো, তবে মেয়াদ আছে। তাই তার কোন অসুবিধার কারণ ছিলনা। তবে দেশে তিনি যে ভাবে সর্বক্ষণ ভারত বিরোধী প্রচারণায় ব্যস্ত থাকেন সেই কারণে তার নামের পাশে একটি বিশেষ চিহ্ন দেয়া আছে যাতে ইমিগ্রেশন অফিসার প্রয়োজন মনে করলে তাকে বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। এমন ব্যবস্থা বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সব দেশেই আছে। ভারতের বিখ্যাত চলচিত্র অভিনেতা শাহরুখ খানকে ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিমান বন্দরে কয়েক ঘন্টা বসিয়ে রেখে নানা ধরণের প্রশ্ন করে তারপর ছেড়েছিল। এরপর তিনি এই বিষয় নিয়ে একটি ছবিও বানিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা কত অযৌক্তিক কারণে একজন যাত্রীকে ফেরত পাঠাতে পারে তা অনেকের ধারণার বাইরে। ডাঃ রহমান হয়তো বুঝতে পারেননি দিল্লি বিমান বন্দরে তার সাথে সংঘটিত ঘটনার বিষয়টি এখন শুধু ভারত নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমান বন্দরের আন্তর্জাতিক তথ্য প্রবাহ ও পরষ্পরের সাথে সংযোগের কারণে ছড়িয়ে পড়েছে। আগামীতে ডাঃ রহমান যেখানেই যান তিনি নানা ধরণের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন। শুধু দিল্লি নয় অনেক গন্তব্যই তার জন্য দূর হয়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে অন্য যে দু’জন সরকারি কর্মকর্তা দিল্লি গিয়েছিলেন তারা সম্মেলেন অংশ নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ও ফিরে এসেছেন।

ডাঃ রহমান যদি লাল পাসপোর্টে ভ্রমণ করতেন তাহলে তাকে হয়তো এত জটিল পরিস্থিতির সম্মূখীন হতে হতো না। দিল্লি বিমান বন্দরের প্রথম ইমিগ্রেশন কাউন্টারটি লাল পাসপোর্টের মতো বিশেষ পাসপোর্টের, যেমন জাতিসংঘের পাসপোর্টধারিদের জন্য সংরক্ষিত। সব কিছু ঠিক থাকলে এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে একজন যাত্রীকে দিল্লিতে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়ে দেয়া হয়।

সার্বিক বিচারে মনে হয় ডাঃ জাহেদুর রহমানের উদ্দেশ্য দিল্লিতে প্রবেশ নয় তার ভারত বিরোধী প্রোফাইলকে আরো সমৃদ্ধ করা। তিনি সেটা বেশ দক্ষতার সাথে করেছেন যা তিনি করতে চেয়েছিলেন। তিনি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন ‘ভারতকে বুঝতে হবে এটা শেখ হাসিনার নতজানু সরকার নয়। এটা তারেক জিয়ার সরকার। এখানে বাংলাদেশ ফার্স্ট’। বাংলাদেশে ভারত বিরোধীদের ধারণা ডাঃ রহমান দিল্লিতে যে নাটকের অবতারণা করেছেন তাতে দেশের ভাবমূর্তির ঔজ্বল্য আরো বেড়েছে। তবে বাংলাদেশে এখন ভোরে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া মুসল্লিদের বন্দুকের গুলি করে আহত করা যায়। সন্ত্রাসিরা পুলিশের সাথে সরাসরি বন্দুক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। চট্টগ্রামে দিন দুপুরে সরকারি দলের পাঁচজন দূর্বৃত্ত একজনকে গুলি করে বেশ ফিল্মি কায়দায় অকুস্থল ত্যাগ করার ঘটনা ঘটেছে। আট বছরের শিশুও ধর্ষকদের হাত হতে রেহায় পায়না। দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো বলাৎকর আর ধর্ষনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সার্বিক বিচারে ডাঃ জাহেদুর রহমানের নেতার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বাক্যটি তার বা তাদের অজান্তেই অনেক আগেই অসার হয়ে গেছে। সময় হয়েছে দেশে চলমান বাস্তব পরিস্থিতির মূখোমূখি হওয়া।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ১৯ জুন, ২০২৬ 

spot_img