ঢাকা, বাংলাদেশ — জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধপন্থী ঘরানার শিক্ষকদের লক্ষ্য করে একটি পরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক অভিযান চালানো হচ্ছে বলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই পদক্ষেপকে ‘শৃঙ্খলামূলক জবাবদিহি’ হিসেবে দাবি করলেও, সংশ্লিষ্টদের মতে—প্রশাসনিক আইনি পরিভাষার আড়ালে এটি আসলে একটি বড় ধরনের ‘রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান’।
ম্যারাথন বৈঠক ও নজিরবিহীন রায়
গত মঙ্গলবার ভোররাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্ষদ ‘সিন্ডিকেট’-এর এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ১৯ জন শিক্ষক এবং দুইজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন প্রশাসনিক ভবনে টানা ১৩ ঘণ্টার এক দীর্ঘ বৈঠক শেষে ভোর ৫টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান উপস্থিত সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের সামনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সিন্ডিকেটের এই রায় অবিলম্বে কার্যকর হবে।
শাস্তির এই তালিকায় রয়েছে বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি, বেতন মূল স্কেলে নামিয়ে আনা এবং পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য সব ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্বে নিষেধাজ্ঞা। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “তদন্ত কমিটির জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার পর সিন্ডিকেট শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছে।”
শাস্তির কবলে যারা
এই প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে সবচেয়ে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবাল; তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রউফ শৈবালকে প্রভাষক পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে।
শাস্তি পাওয়া অন্যান্য জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের মধ্যে রয়েছেন—নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ইসরাফিল আহমেদ রাঙা, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদ, লোকস্বাস্থ্য ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দিন সিকদার এবং সাবেক প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম ফিরোজ-উল-হাসান। তাদের সবার বেতন এক ধাপ নামিয়ে মূল স্কেলে আনা হয়েছে এবং আগামী ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সাবেক উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের বেতন গ্রেড-২-এ নামিয়ে আনার পাশাপাশি তার ওপরও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়াও বেশ কয়েকজন শিক্ষকের ইনক্রিমেন্ট বাতিল এবং কয়েকজনকে আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উপ-রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিহিংসার অভিযোগ ও ক্ষোভ
এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা যা দেখছি তা কোনো প্রশাসনিক বিচার নয়, বরং শৃঙ্খলামূলক তদারকির নামে সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। এই শিক্ষাবিদেরা কেবল একটি ধ্বংসাত্মক নীলনকশার বিরোধিতা করেছিলেন যা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে বিপন্ন করতে চেয়েছিল। আর ঠিক এই কারণেই আজ তাদেরকে বেছে বেছে নিশানা করা হচ্ছে।”
যদিও বিভিন্ন মহলে এই শিক্ষকদের “ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী” হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চলছে, তবে তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের দাবি—এই শিক্ষকেরা সম্পূর্ণ দেশপ্রেম ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
পটভূমি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এই ব্যাপক ব্যবস্থার মূলে রয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি, যার ফলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছিল। সেই সময়কার ক্ষমতা পরিবর্তনকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মতে, তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই ঘটনাকে ‘বিপ্লব’ বললেও আসলে সেটি ছিল বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি বিদেশি মদদপুষ্ট সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আন্দোলনে এমন কিছু শক্তি সক্রিয় ছিল যারা ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। অভিযুক্ত শিক্ষকেরা দাবি করেন, তারা কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রকে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানে দেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকলেও অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে শুরু হওয়া এই দমনপীড়নের ধারা অব্যাহত থাকায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বাধীনতা এখন চরম সংকটের মুখে।
উচ্চতর তদন্তের জাল
প্রশাসনিক এই শুদ্ধি অভিযানের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম, সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম এবং সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক রাশেদা আখতারের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে তিনটি পৃথক শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
একদিকে শিক্ষকদের ওপর কঠোর খড়্গ চললেও, অন্যদিকে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট ৪৩ জন নেতা-কর্মীর সাময়িক বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার বা মওকুফ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনি ত্রুটি আড়াল করতেই প্রশাসন এই নমনীয়তা দেখিয়েছে। সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি মুক্তচিন্তা ও একাডেমিক স্বাধীনতা হরণের এক চরম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন দেশের সচেতন মহল।

