ঢাকা শহরের ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর সড়ক বললে দেশের মানুষ, হোক তিনি একজন খেটে খাওয়া মানুষ বা দেশের কোনো উচ্চবিত্ত, তাদের বলতে হয় না ওই সড়ক কেন বিখ্যাত। সকলে জানে ওই সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাড়ি আছে বা ছিল। বিশ্বে এমন নজির খুব কমই আছে, যেখানে একটি শহরের একটি শাখা সড়ক একজন ব্যক্তি বা তার পরিবারের কারণে এমনভাবে জনগণের কাছে চিহ্নিত হয়েছে। অথচ সড়কটিকে ঢাকা সিটি করপোরেশন এগারো নম্বর সড়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা কারও কাছে তেমন পরিচিত নয়। ঢাকার বাহির থেকে আসা যে কোনো মানুষ কোনো পরিবহনচালককে ‘ধানমন্ডি বত্রিশ’ যাবো বললে চালক যাত্রীকে বত্রিশ নম্বর সড়কে নিয়ে আসবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে দেশের মানুষ তাদের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার মাঝেও দেশের ও দেশের বাইরের নানা বিষয় নিয়ে চর্চা করে। অনেক বিষয়ের মধ্যে গত কয়েকদিন যাবৎ মানুষ যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে বেশ ব্যস্ত আছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একজন জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের তিন নম্বর স্ত্রী হওয়া। বিয়ে হওয়ার পরই নাকি সেই স্মার্ট উপস্থাপিকা জানতে পারেন, তার স্বামী নাকি আগে দুটো বিয়ে করেছেন। একটাকে ডিভোর্স দিয়েছেন, আর একটা আছে। উপস্থাপিকা ঘোষণা করলেন, তিনি সতিনের সংসার করবেন না। এই সব বিষয় তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। দ্বিতীয় যে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে, সেটি বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামানের দাড়ি। ওয়াকারুজ্জামানের নাম দেশের আপামর জনগণ ২০২৪ সালের তথাকথিত গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বে না জানলেও সেই থেকে দেশের মানুষ জানে। অভ্যুত্থানের নামে সেটি ছিল বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের নবউত্থান, যার পেছনে ওয়াকারুজ্জামান ও তার মিত্রদের একটা বড় ভূমিকা আছে বলে এখন জনস্বীকৃত। ওয়াকারুজ্জামান সম্প্রতি পবিত্র হজব্রত করে এসেছেন। হজব্রত শেষে অনেকেই দাড়ি রাখেন। এটিকে সুন্নত হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি একজন মানুষের একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। তা নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা-সমালোচনা হওয়ার কথা নয়, তবে কিছুটা হলেও হচ্ছে। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। প্রথমে ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কথায় আসি।
ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর (সরকারি খাতায় এগারো নম্বর) অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত তেত্রিশ কাঠা জমির উপর নির্মিত। ১৯৫৭ সালে জমি বরাদ্দ পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু অনেকদিন তা ফেলে রেখেছিলেন। বরাদ্দকৃত এই জমির জন্য বঙ্গবন্ধু সরকারকে এক হাজার টাকা জমা দিয়েছিলেন। তাজউদ্দিন তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, এই জমি ক্রয়ের জন্য তিনি তাঁর মুজিব ভাইকে বললে জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘সেখানেতো সন্ধ্যা হলেই শিয়াল ডাকে’। বর্তমান সাতমসজিদ রোডের উপর তাজউদ্দিনের পুরোনো বাড়িটা ভেঙে তার উপর বড় টাওয়ার উঠেছে। তবে তাঁর লাগানো বাড়ির সামনের আমগাছটা এখন অনেক বড় হয়েছে। ২০২৪-পরবর্তী মব সন্ত্রাসীরা এই গাছের খবর জানলে হয়তো তা এতদিন উচ্চশিরে দাঁড়িয়ে থাকত না।
বেগম মুজিবের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বিয়ে হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। ১৯৪২ সালে বঙ্গবন্ধু মেট্রিক পাস করার পর কলকাতা চলে যান কলেজে ভর্তি হতে। বেগম মুজিব রয়ে যান টুঙ্গিপাড়ায়। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কলকাতায় ছিলেন। ১৯৪৭-এ বাংলা ভাগ হওয়ার পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। তাঁর থাকার কোনো জায়গা ছিল না। কিছুদিন এদিক-ওদিক করে পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে তিনি সেগুনবাগিচায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে তাঁর পরিবারকে ঢাকা নিয়ে আসেন। চুয়ান্ন সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ার পর মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে সপরিবারে উঠে যান। যুক্তফ্রন্ট সরকারের আয়ু ছিল মাত্র ২৭ দিন। পাকিস্তান সরকার শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের এই মন্ত্রিসভা ভেঙে দিলে বঙ্গবন্ধু সরকারি বাড়ি ছেড়ে নাজিরাবাজারের এক ভাড়া বাসায় ওঠেন। বৃষ্টি হলে ওই বাসায় পানি উঠত। কিছু দিন পর সেই বাসা ছেড়ে আরমানিটোলার আর একটি বাসায় ওঠেন। বেকার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে ১৯৬০ সালে আলফা ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি নেন। অনেকটা বেগম মুজিবের উৎসাহে এই সময় ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের বাড়ি নির্মাণের কাজে হাত দেওয়া হয়। এই বাড়ি নির্মাণে তিনি তাঁর সঞ্চয় থেকে কিছু অর্থও যোগান দেন। বঙ্গবন্ধু কিছু অর্থ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে ঋণ নেন। ১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসের দিকে একটি অর্ধসমাপ্ত দুই কামরার একতলা বাড়িতে তিনি পরিবার নিয়ে উঠে আসেন। এক কক্ষে তিনি আর বেগম মুজিব, আর অন্য কক্ষে শেখ হাসিনা আর তাঁর তিন ভাইবোন। ধানমন্ডির বাড়িতে শুধু শেখ রাসেলের জন্ম হয়। বাকি চার ভাইবোনের জন্ম টুঙ্গিপাড়ায়।
কালক্রমে ধানমন্ডির বত্রিশের বঙ্গবন্ধুর এই বাড়ি হয়ে ওঠে বাংলাদেশ আর বাঙালির ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বাড়িতে থেকেই বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে। দলের কার্য পরিচালনার জন্য কেউ অফিস ভাড়া দিতে না চাইলে এই বাড়িটি হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগের অঘোষিত কার্যালয়। এই বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের শাসনামলে অসংখ্যবার গ্রেপ্তার হন। এই বাড়ি হতেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দেশ স্বাধীন হলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বেইলি রোডে অবস্থিত বর্তমান ফরেন সার্ভিস একাডেমির মূল ভবনকে (পুরোনো রাষ্ট্রপতি ভবন, পরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘সুগন্ধা’) প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। এই ভবনটিকে নতুন নামকরণ করা হয় ‘গণভবন’ হিসেবে। বঙ্গবন্ধু প্রতি সন্ধ্যায় ভবনের সামনে এসে সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন। রাতে ফিরতেন ধানমন্ডির নিজ বাসভবনে। সেখানে অপেক্ষা করছেন বেগম মুজিব ও তাঁর সন্তানরা। নিচে হয়তো দলের কোনো নেতাকর্মী।
১৯৭২ সালের মাঝামাঝি বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে দিল্লি থেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডো ব্যাটালিয়নের জনক হিসেবে পরিচিত জেনারেল সুজান সিং উবান। তাঁর প্রণীত স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘ফ্যান্টমস অব চিটাগাং—দি ফিফথ আর্মি’-তে তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘আমার মনে হলো প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনটি নিরাপত্তার দিক হতে খুবই অরক্ষিত। যে কেউ ইচ্ছা করলেই প্রবেশ করছে আর বাহির হচ্ছে। আমি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনলে তিনি বলেন, “আমাকে দেশের মানুষ জাতির পিতা বলে। পিতাতো তার সন্তানদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিতে পারে না”’ (অবিকল অনুবাদ নয়)। নিরাপত্তার কারণে দেশের অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে স্থানান্তরিত হতে বলেছিলেন। ততদিনে এই ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বেগম মুজিব রাজি হননি। তিনি বলতেন, ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের প্রতিটি ইটে তাঁর ঘাম লেগে আছে। বঙ্গবন্ধুও তাঁকে আর জোর করেননি। তবে সরকারি বাসভবন তিনি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করতেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তখন সংসদ ভবন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই ভবনেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। দেয়ালের গায়ে ঘাতকদের গুলির দাগ ছাড়া ভবনের আর কোনো ক্ষতি হয়নি। আসবাবপত্রসহ বাড়ির সবকিছু অক্ষতই ছিল। বাড়ি দখল নেয় সরকার। ১৯৮১ সালে ছয় বছর নির্বাসিত জীবন শেষে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়িতে গিয়ে দোয়া পড়তে চাইলে রাষ্ট্রপতি জিয়া বাধা সাজেন। শেখ হাসিনা রাস্তার উপর বসে পরিবারের সদস্য আর কিছু দলীয় নেতাকর্মী নিয়ে দোয়া পড়েন। এরশাদের শাসনামলে শেখ হাসিনাকে এই বাড়ির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কিছু সংস্কারের পর শেখ হাসিনা এই বাড়িতে ওঠেন। কিছুদিন পর তিনি ধানমন্ডিতে অবস্থিত তাঁর স্বামীর নিজস্ব বাড়ি ‘সুধা সদনে’ ওঠেন। এই বাড়ি থেকেই তিনি এক-এগারোর পর গ্রেপ্তার হন।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বত্রিশ নম্বরের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িকে শেখ হাসিনা ১৯৯৪ সালে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে ঘোষণা করেন। দিল্লিতে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সরকারি বাসভবনকে ১৯৬৪ সালে একটি জাদুঘর হিসেবে উদ্বোধন করা হয়। যে কেউ এই জাদুঘরে টিকিট কেটে প্রবেশ করতে পারে। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আছে দেশটির জাতির জনক হিসেবে খ্যাত কামাল আতাতুর্কের সরকারি বাসভবন ‘ডোলমাবাহচে’ প্রাসাদ। এটি কামাল আতাতুর্কের সরকারি ভবন ছিল। বিশাল এলাকা জুড়ে এটি এখন একটি স্মৃতি জাদুঘর। সারা তুরস্ক জুড়ে আছে কামাল আতাতুর্কের অসংখ্য ভাস্কর্য। বর্তমানে এরদোয়ান সরকার একটি কামাল আতাতুর্কবিরোধী ডানপন্থি সরকার হওয়া সত্ত্বেও আতাতুর্কের সকল স্মৃতি সে দেশে সংরক্ষিত আছে। সাংবিধানিকভাবে দেশটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সেনাবাহিনী চাইলেই ক্ষমতা দখল করতে পারে না। এটি কামাল আতাতুর্ক সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করে গিয়েছেন। এতদিন পরেও আতাতুর্কের কোনো নীতি বা সংবিধান সংস্কারের নামে কেউ কোনো কিছুর পরিবর্তন করার সাহস দেখায়নি। তার কারণ, সে দেশে ড. ইউনূসের মতো কেউ কখনো ক্ষমতা দখল করেননি।
শেখ হাসিনা বত্রিশ নম্বরের বাড়িটিকে জাদুঘর হিসেবে উৎসর্গ করার পর তিনি ‘বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ নামের একটি ট্রাস্ট গঠন করেন। এই ট্রাস্টে জাদুঘর হতে প্রাপ্ত সকল অর্থ জমা হয়। একই সঙ্গে পরিবারের আয় হতে অর্থ অথবা অন্য যেকোনো ব্যক্তির অনুদান এই ট্রাস্টে জমা করার তিনি ব্যবস্থা করেন। এই ট্রাস্টের অর্থ খরচ করা হয় শিক্ষা বৃত্তি, স্বাস্থ্য সহায়তা ইত্যাদি জনকল্যাণকর কাজে। আইন অনুযায়ী এই ট্রাস্টের সকল আয়কে করমুক্ত ঘোষণা করা হয়। ড. ইউনূস ক্ষমতা দখল করার পর ট্রাস্টের এই সুবিধা বাতিল করে দেন আর অন্যদিকে নিজের গ্রামীণ ব্যাংকের সকল কর ২০২৯ সাল পর্যন্ত মওকুফ করিয়ে নেন। এখন থেকে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টকে বছরে তার আয়ের উপর ২০% কর দিতে হবে।
ইউনূসের শাসনকালের শুরুতে যে ভয়াবহ নৈরাজ্য শুরু হয়েছিল, তার প্রথম টার্গেট ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর সকল স্মারক। শুরুতেই ভাঙা হলো বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি। এই ধ্বংসযজ্ঞ চলে তিন দিন ধরে। আনা হলো সিটি করপোরেশনের ক্রেন। নেতৃত্বে তথাকথিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা ওসমান হাদি, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, নাসিরউদ্দিন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবদুল হান্নান মাসুদসহ আরো অনেকে। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এই ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে লন্ডনে বসবাসরত তাদের নেতার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘ভাইয়া, তোমার কথা মতো বত্রিশ নম্বর ভেঙেছি।’ এই সকল দুর্বৃত্তদের পাহারা দেওয়ার জন্য ওয়াকার নিয়োজিত করল সেনাবাহিনীর সদস্যদের। দুই-একজন বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধা প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের চরমভাবে নাজেহাল করা হলো। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে ভাঙা হলো তাঁর গাড়ি। এর পর সেই ভাঙাবাড়িকে পাহারা দেওয়ার জন্য বসানো হলো পুলিশ পাহারা। ধারণা করা হয়েছিল, তারেক রহমান সরকারের সময় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। না, কোনো কিছু হয়নি। অথচ তাঁর মা কতদিন এই বাড়িতে মোড়া পেতে বসে ছিলেন নিজ জীবনের এক ক্রান্তিকালে। এই ভবনে তাঁর পিতা জেনারেল জিয়া এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে। যেই নির্বোধরা বত্রিশ নম্বরের এই ঐতিহাসিক ভবনটি ভেঙেছে, তারা হয়তো জানে না, এমন একটি ভবন শুধু ইটের গাঁথুনির একটি ভবন নয়। এটি দেশের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একদিন ইউনূস, ওয়াকার বা তথাকথিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দুর্বৃত্তদের নাম ইতিহাস মনে রাখবে না, কিন্তু ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়িটি এই দেশের সাধারণ মানুষ আর ইতিহাস মুজিবরের বাড়ি হিসেবে মনে রাখবে।
সেনাপ্রধান ওয়াকারুজ্জামান হজব্রত পালন করতে পবিত্র মক্কায় গিয়েছিলেন। সংবাদে প্রকাশ, তিনি সেখানে জামায়াতের আমিরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে বিদেশের কয়েকজন প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। তারা শলাপরামর্শ করেছেন আগামীতে জামায়াতকে কীভাবে ক্ষমতায় আনা যায়। বিদেশের প্রতিনিধিরা বৈশ্বিক রাজনীতির কারণে তাতে তেমন একটা সায় দেননি। জেনারেল ওয়াকার মুখে দাড়ি নিয়ে ফিরে এসেছেন। তবে সেনাবাহিনীতে দাড়ি রাখতে হলে কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। তা তিনি করেছেন কি না, জানা যায়নি। তবে সাধারণ মানুষ আবার তাঁর এই নতুন অবয়বের পেছনে অন্য কিছু লুকানো আছে কি না, তা উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করছে।
শেখ হাসিনা ওয়াকারকে বিশ্বাস করেছিলেন তাঁর নিকট আত্মীয় বলে। ১৯৯৬ সালে প্রথম দফায় ক্ষমতায় এসে ওয়াকারের শ্বশুর ও শেখ হাসিনার ফুফা জেনারেল মুস্তাফিজকে অবসর-পূর্ব এলপিআর থেকে ডেকে সেনাপ্রধান বানিয়েছিলেন। ২০০০ সালে শেখ হাসিনা যখন সরকারপ্রধান, তখন ওয়াকারের শ্যালি সোফিয়া জেরিন ৪৭তম বিএমএ লং কোর্সে যোগ দেন। তিনি বর্তমানে আর্মি সিগন্যাল কোরে কর্মরত একজন লে. কর্নেল। শেখ হাসিনার পরিবারের এই সদস্যদের একজন জেনারেল ওয়াকার। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তিনি যদি তাঁর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতেন, তা হলে দেশে আজ স্বাধীনতাবিরোধীরা এমন উল্লাসনৃত্য করতে পারত না। ওয়াকার তাঁর অবয়ব বা চেহারা যতই পরিবর্তন করুক না কেন, ইতিহাসে তাঁর স্থান নির্ধারিত হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ আর ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের বাড়ির স্থানও ইতিহাসে নির্ধারিত। মনে রাখতে হবে, বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে যারা বেইমানি করেছিলেন, তাদের কারও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
১৭ জুন, ২০২৬

