ঢাকা, ১৬ জুন — উগ্র ইসলামপন্থীদের বাধায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে হিন্দুদের উপাস্য রামের মূর্তি নির্মাণকাজ স্থগিত এবং শ্রী রামচন্দ্রের ছবি ‘অবমাননার’ প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল থেকে মশাল মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশ থেকে অবিলম্বে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে গাইবান্ধায় নির্মাণাধীন রামমূর্তি প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু করার দাবিও তোলেন বিক্ষোভকারীরা।
‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক রাম প্রসাদ সাহা তপু বলেন, “শ্রী রামচন্দ্র আমাদের দশ অবতারের অন্যতম আরাধ্য দেবতা। সম্প্রতি একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী রামচন্দ্রকে নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে। এরপর আরেকটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী আমাদের আরাধ্য দেবতার ছবি অবমাননা করেছে।”
তিনি বলেন, “এর মাধ্যমে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে। আমরা চাই এই দেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে বসবাস করুক। কিন্তু একটি গোষ্ঠী বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়। সেই অপশক্তিকে রুখে দিতে হবে।”
জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) দ্বীপজয় সরকার দ্বীপ্ত অভিযোগ করেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বহু হামলার ঘটনা ঘটলেও সেসবের বিচার হয়নি।
তিনি বলেন, “গত দুই বছরে দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর ধর্ম অবমাননার নামে অসংখ্য হামলা হয়েছে। অনেক মামলা হয়েছে, কিন্তু কোনো মামলারই বিচার হয়নি। উল্টো আমরা দেখেছি, দীপু চন্দ্র দাশ হত্যাকাণ্ডের আসামিকে প্রকাশ্যে জামিন দেওয়া হয়েছে। অথচ হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হলে তার কোনো বিচার হয় না।”
জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত প্রামাণিক বলেন, “নির্বাচনের আগে প্রায় সব সরকারই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হয় না। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাই, অবিলম্বে অবমাননার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
দ্রুত বিচার না হলে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
গাইবান্ধার রামমূর্তি প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক
ঢাকার এই বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর এলাকায় শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ ও কালীমন্দির প্রাঙ্গণে নির্মাণাধীন একটি বিশাল রামমূর্তি প্রকল্পকে ঘিরে কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনা।
মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি নির্মিত হলে দেশের সবচেয়ে বড়, এমনকি এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ রামমূর্তি হবে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক নির্মাণকাজও শুরু হয়েছিল। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করে ইসলামপন্থী বিভিন্ন গ্রুপ। কয়েকটি ইসলামি সংগঠন এর বিরোধিতা করে কর্মসূচি পালন ও সাম্প্রদায়িক হামলার হুমকি দিতে শুরু করে।
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মুখে গত বৃহস্পতিবার মন্দির ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল কুমার মহন্ত রামমূর্তি নির্মাণকাজ আপাতত স্থগিত করার ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, “ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
শ্যামল কুমার মহন্ত আরও বলেন, “আমরা বাঙালি। সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বিশ্বাস করি। ভবিষ্যতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে মন্দিরের নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম চলমান থাকবে।”
সংবাদ সম্মেলনে মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপিন চন্দ্র বর্মণ, সহ-সাধারণ সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র বর্মণ এবং মন্দির প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস উপস্থিত ছিলেন।
ইমাম-ওলামা পরিষদের ৮ দফা দাবি
রামমূর্তি প্রকল্পের বিরোধিতায় গাইবান্ধা ও পলাশবাড়ীতে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে ইমাম-ওলামা পরিষদ। সংগঠনটির নেতারা প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল এবং নির্মাণাধীন কাঠামো অপসারণের দাবি জানান।
সংগঠনটির জেলা সেক্রেটারি মুফতি মানছুর রহমান খান লিখিত বক্তব্যে বলেন, “জনশ্রুতি অনুযায়ী এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ রামমূর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করেছে।”
তিনি দাবি করেন, রংপুর বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে এত বড় মূর্তি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
সংগঠনটি আট দফা দাবিতে প্রকল্পটির অর্থায়নের উৎস, ব্যয়ের পরিমাণ, দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা, আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য বিদেশি প্রভাব খতিয়ে দেখতে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে—
- প্রকল্পের সব কার্যক্রম বন্ধ রাখা;
- অর্থায়নের উৎস ও আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত;
- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের উৎস যাচাই;
- কোনো বিদেশি ব্যক্তি, রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না তা তদন্ত;
- জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন;
- প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত;
- বিদেশি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ যাচাই;
- প্রয়োজন হলে কূটনৈতিক পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণ।
এর আগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আট দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপিও জমা দেওয়া হয়।
মানববন্ধন থেকে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
শুক্রবার জুমার নামাজের পর পলাশবাড়ী উপজেলার চারমাথা মোড়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে উপজেলা ইমাম-ওলামা পরিষদ। একই দাবিতে জেলার অন্যান্য স্থানেও কর্মসূচি পালনের কথা জানায় সংগঠনটি।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বক্তারা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নির্মাণাধীন রামমূর্তি অপসারণ এবং প্রকল্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য তদন্তের দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন উপজেলা ইমাম-ওলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা ছাদেকুল ইসলাম, সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা শাহ আলম ফয়েজী, উপজেলা জামায়াত নেতা ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবু তালেব মাস্টার, অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা এবং খাইরুল ইসলাম চান।
নিরাপত্তা জোরদার
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কায় শুক্রবার সকাল থেকেই পলাশবাড়ীর চারমাথা মোড়, কোমরপুর মোড় এবং হাসবাড়ী এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সংখ্যালঘু অধিকার ও সম্প্রীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক
গাইবান্ধার রামমূর্তি প্রকল্প এবং তা ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নতুন করে বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জনপরিসরে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশের অধিকারকে সম্মান জানানো উচিত। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের বক্তব্য, মুসলিম প্রধান দেশে বড় আকারের হিন্দু দেবতার মূর্তি স্থাপন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
এমন বাস্তবতায় প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সব পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা।

