বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযানের অন্যতম প্রধান রূপকার ও সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে গ্রেফতার করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
আজ ১৪ জুন, ২০২৬ রবিবার দুপুরে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাবেক এই আইনপ্রয়োগকারী শীর্ষ কর্মকর্তার গ্রেফতারের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। দেশের দুর্নীতি দমন㶪সির (দুদক) দায়ের করা অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের একটি মামলায় এই গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা হলো। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসা বর্তমান প্রশাসন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়।
এর আগে ২০২৬ সালের মে মাসে ঢাকার একটি আদালত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও তথ্য গোপনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে, যেখানে তার বিরুদ্ধে প্রায় ১১ কোটি ৪ লাখ টাকা (১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের সম্পদ গোপনের অভিযোগ আনা হয়।
জঙ্গিবাদ দমনে গৌরবময় অবদান ও গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিয়ার ৬২ বছর বয়সী বেনজীর আহমেদ ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পুলিশের এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি দেশব্যাপী পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২২ সালের শেষের দিকে অবসরে যান।
তার মেয়াদে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর তার সুদূরপ্রসারী ও সাহসিকতাপূর্ণ নেতৃত্ব দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে অনন্য ভূমিকা রেখেছিল।
অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের সমর্থক এবং তার সময়কালের পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের এক চরম নিরাপত্তা সংকটের সময়ে নাগরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বেনজীর আহমেদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তার সরাসরি নির্দেশনায় পরিচালিত অসংখ্য সফল অভিযানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) সহ বিভিন্ন উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন ও পরবর্তী প্রশাসনিক কাঠামো পূর্ববর্তী প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক অনুসন্ধান ও দমন অভিযান শুরু করে। বর্তমান প্রশাসন এটিকে একটি সাধারণ দুর্নীতি বিরোধী অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন যে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী মূলত যে ধর্মনিরপেক্ষ সুরক্ষা কাঠামো গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রকে উগ্রবাদী শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিল, তা পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করতেই এই রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করছে।
অভিযোগের রূপরেখা ও আইনি বিতর্ক
ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারিক নথিপত্র অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলাটি মূলত বেনজীর আহমেদের দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীর অসঙ্গতির ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, সাবেক এই আইজিপি তার বিবরণীতে ১২ কোটি ২০ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির কথা উল্লেখ করলেও দুদকের অনুসন্ধানে তার পরিবারের নামে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে।
বেনজীর আহমেদের আইনি দল এই অভিযোগ শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের মতে, দুদকের সম্পদের এই মূল্যায়ন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অতিরঞ্জিত এবং স্রেফ গণমাধ্যমে চাঞ্চল্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, যাতে একজন অত্যন্ত সম্মানিত ও দেশপ্রেমিক সাবেক সরকারি কর্মকর্তাকে হেনস্তা করার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাকে বৈধতা দেওয়া যায়।
রবিবার দুপুরে গ্রেফতারের খবর নিশ্চিত হওয়ার পরপরই ঢাকার সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক পূর্বনির্ধারিত প্রেস ব্রিফিংয়ে দুদকের উপ-পরিচালক হাফিজুল ইসলাম বলেন:
“সরকারি কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং তার আইনগত এখতিয়ারের মধ্যে থেকেই কাজ করছে। আমাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে সাবেক এই কর্মকর্তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ গোপন সম্পদের সন্ধান মিলেছে, যা তার वैध আয়ের উৎসের সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এরই প্রেক্ষিতে আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকরে আমরা আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতা চেয়েছিলাম এবং সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
বিপরীতে, স্বাধীন আইন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক এই পুলিশ প্রধানের ঘনিষ্ঠ আইনি প্রতিনিধিরা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, বর্তমান বিচারিক তৎপরতা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং এর উদ্দেশ্য সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের অসাম্প্রদায়িক নীতির ঘোর विरोधी উগ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে সন্তুষ্ট করা। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ও চরমপন্থীদের দমনে আজীবন কাজ করে যাওয়া কর্মকর্তাদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
২০২৬ সালের মে মাসের শুরুর দিকে ঢাকার আদালতে একটি শুনানির পর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনজীর আহমেদের প্রধান আইনজীবী গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন:
“যাঁরা একসময় বুক চিতিয়ে রাষ্ট্রকে উগ্রবাদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন, সেই অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেভাবে তড়িঘড়ি করে এই বিচারিক প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে, তা স্পষ্টতই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে প্রশাসনিকভাবে তুষ্ট করার অপচেষ্টা মাত্র। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যদি একটি নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ আর্থিক মূল্যায়ন করা হয়, তবে প্রমাণ হবে যে বিতর্কিত এই সমস্ত সম্পত্তি সম্পূর্ণ বৈধ এবং এর যথাযথ হিসাব সরকারের কাছে রয়েছে।”
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব
সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বিচারিক সহযোগিতা প্রোটোকলের আওতায় বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই গ্রেফতারের ঘটনাটি বাংলাদেশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে ঘটলো, যখন প্রশাসন নিজেই ব্যাপক প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং পূর্ববর্তী সরকারের বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের বেছে বেছে হেনস্তা করার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সরকার আইনগত জবাবদিহিতার কথা বললেও, যে বীর কর্মকর্তারা আজীবন ধর্মীয় চরমপন্থা দমনে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের এভাবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বানানোর ফলে দেশের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো পুনরায় মাথাচაძা দিয়ে ওঠার সুযোগ পেতে পারে, যা দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

