ভূ-সীমার চেয়ে মানুষ বড়

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ-ইন ও পুশ-ব্যাকের ঘটনায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের দুর্ভোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে মানবিকতা, কূটনীতি ও আইনের শাসন নিয়ে।

দেড় বছরের একটি শিশু। কুষ্টিয়ার প্রাগপুর সীমান্তে মায়ের কোল ঘেঁষে বসে আছে। মাথার ওপর জ্বলন্ত রোদ। চারদিকে খোলা মাঠ। সামনে কাঁটাতারের বেড়া। পেছনে অনিশ্চয়তা। তার কোনো ধারণা নেই ভারত কী, বাংলাদেশ কী, পুশ-ইন কী, কূটনীতি কী। সে শুধু জানে সে ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নানা প্রান্ত থেকে এমন অসংখ্য দৃশ্য উঠে এসেছে, যা শুধু একটি সীমান্ত-সংকটের গল্প নয়; বরং মানবতার এক কঠিন পরীক্ষার গল্প।

কুষ্টিয়া, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, যশোর, সিলেট—একটির পর একটি সীমান্ত এলাকায় এমন মানুষদের দেখা গেছে, যারা দুই দেশের মাঝখানে আটকে পড়েছেন। তাদের কেউ নারী, কেউ শিশু, কেউ বৃদ্ধ। কেউ দাবি করছেন তারা বাংলাদেশের নাগরিক। কেউ বহু বছর আগে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন। কারও পরিচয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিতর্ক।

কিন্তু একটি বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

তারা সবাই মানুষ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্প্রতিক আলোচনায় সবচেয়ে কম গুরুত্ব পাচ্ছে এই বিষয়টিই।

আমরা শুনছি পুশ-ইন, পুশ-ব্যাক, অবৈধ অনুপ্রবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কূটনৈতিক প্রতিবাদ, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি—কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কথা যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি বলছে, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ১৮ থেকে ২১টি পুশ-ইনের চেষ্টা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে এভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও ২,৩০৩ জনের কথা বলা হয়েছে, কোথাও ২,৪৭৯ জনের হিসাব উঠে এসেছে। সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সমস্যার অস্তিত্ব নিয়ে নয়।

প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলো কারা?

তাদের সবাই কি বাংলাদেশি?

নাকি তাদের মধ্যে ভারতীয়ও আছে?

জামালপুর সীমান্তের ষষ্টি চন্দ্র বর্মণের ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়ে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন তার ছবি ভাইরাল হচ্ছিল, তখন কেউ বলছিলেন তিনি ভারতের চেন্নাইয়ের বাসিন্দা, কেউ বলছিলেন তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। শেষ পর্যন্ত পরিচয় যাচাই করে দেখা গেল তিনি রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বাসিন্দা এবং বাংলাদেশের নাগরিক।

এই ঘটনাই প্রমাণ করে জাতীয়তা কোনো অনুমানের বিষয় নয়।

কেউ বাংলা ভাষায় কথা বললেই তিনি বাংলাদেশি নন। আবার কেউ সীমান্তের ওপারে থাকলেই ভারতীয় হয়ে যান না। জাতীয়তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন কাগজপত্র, তদন্ত, প্রশাসনিক যাচাই এবং দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ।

সে কারণেই প্রশ্ন উঠছে—যদি মানুষগুলো সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন, তবে তাদেরকে সঠিক প্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে না কেন?

আর যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক না হন, তবে কিসের ভিত্তিতে তাদের সীমান্তে এনে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের সীমান্তের বাইরেও তাকাতে হবে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভিবাসন বহুদিন ধরেই একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজেপি বহু বছর ধরে দাবি করে এসেছে যে বিপুল সংখ্যক অবৈধ অভিবাসী ভারতে বসবাস করছে এবং তাদের শনাক্ত করে ফেরত পাঠানো প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর এই প্রশ্ন নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাজ্য সরকার প্রকাশ্যে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ নীতির কথা বলেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার মানুষকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং অনেককে ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ রাখা হয়েছে।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি অভিবাসন ও নিরাপত্তা প্রশ্ন।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি সার্বভৌমত্ব ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন।

সমস্যা হলো, মাঝখানে আটকে পড়া মানুষগুলোর কাছে এটি বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত চুক্তি থাকলেও অবৈধ অভিবাসীদের পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর এবং বিস্তৃত কোনো দ্বিপক্ষীয় কাঠামো নেই। ফলে যখনই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন দুই দেশের প্রশাসন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।

পুলক ঘটক

বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট। ঢাকা বলছে, যাদেরকে বাংলাদেশি দাবি করা হচ্ছে, তাদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করতে হবে। তালিকা দিতে হবে। কাগজপত্র দিতে হবে। তারপর নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলে বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করবে।

ভারত বলছে, বহু বছর ধরে হাজার হাজার সন্দেহভাজন বাংলাদেশির তালিকা যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি।

দুই পক্ষের যুক্তির মধ্যে বাস্তবতা হলো—মানুষগুলো সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

একটি সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়া উচিত নয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অভিবাসন নতুন কোনো ঘটনা নয়।

সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া কিংবা উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে বহু মানুষ দশকের পর দশক ধরে কাজের সন্ধানে ভারতে গেছেন। কেউ মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে, কেউ নির্মাণকর্মী হিসেবে, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে। অনেকে সেখানে বছরের পর বছর থেকেছেন।

এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু এটিও সত্য যে বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকেই মানুষ উন্নত জীবনের আশায় সীমান্ত অতিক্রম করে।

মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্র।

উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপ।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য।

অবৈধ অভিবাসন কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি অনিবার্য ফল।

যেখানে কাজ আছে, মানুষ সেখানে যেতে চায়।

যেখানে আয় বেশি, মানুষ সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করে।

আইনসঙ্গত পথে না পারলে অনেকে অবৈধ পথও বেছে নেয়।

এটি নৈতিকভাবে সঠিক কি না, সে বিতর্ক আলাদা। কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না।

যে শ্রমিক সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যায়, সে সাধারণত রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করতে যায় না। সে যায় কাজের সন্ধানে। পেটের তাগিদে। পরিবারের জন্য।

এ কারণেই অভিবাসনের প্রশ্নকে শুধুমাত্র নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হয় না।

আবার এটাও সত্য যে রাষ্ট্রের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে।

তাই সমাধান একপাক্ষিক হতে পারে না।

ভারত যদি মনে করে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক, তবে তার পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ যদি দেখে তিনি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক, তবে তাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। পৃথিবীর বহু দেশ এভাবেই কাজ করে।

আমেরিকা থেকে যখন বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ফেরত পাঠানো হয়, তখন কাগজপত্র, পরিচয় যাচাই এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

মানবপাচারের শিকার নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও ভারত বহুবার যৌথভাবে কাজ করেছে। উদ্ধার হওয়া মানুষদের পরিচয় যাচাই করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অর্থাৎ প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তোলা অসম্ভব নয়।

সমস্যা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

দুঃখজনকভাবে এই পুরো বিতর্কে আরেকটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—অতি-জাতীয়তাবাদ।

এক পক্ষ সবকিছুর জন্য ভারতকে দায়ী করছে।

অন্য পক্ষ সব অভিবাসীকে অপরাধী হিসেবে দেখছে।

দুটি অবস্থানই বিপজ্জনক।

ভারতকে গালাগালি করলে সীমান্তে আটকে থাকা শিশুটির খাবার জুটবে না।

আবার অবৈধ অনুপ্রবেশের অজুহাতে একজন বৃদ্ধকে দিনের পর দিন নো-ম্যানস-ল্যান্ডে ফেলে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সীমান্ত রক্ষা করা নয়; মানুষের মর্যাদা রক্ষা করাও।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে যেসব মানুষকে দেখা গেছে, তাদের অধিকাংশের মুখে আতঙ্ক। কেউ জানেন না কোথায় যাবেন। কেউ জানেন না তারা আদৌ কোনো দেশে গ্রহণযোগ্য কি না।

এমন দৃশ্য দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের জন্য লজ্জাজনক।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধুমাত্র কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, নদী, মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছু মিলিয়ে এই সম্পর্ক বহুস্তরীয়। মতপার্থক্য থাকবে, সীমান্ত সমস্যা থাকবে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকবে। কিন্তু কোনো মতপার্থক্যই এমন জায়গায় পৌঁছানো উচিত নয়, যেখানে শিশুদেরকে কাঁটাতারের মাঝখানে রাত কাটাতে হয়।

আজ প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, সমাধান।

প্রয়োজন নতুন করে একটি যৌথ প্রত্যাবাসন কাঠামো।

প্রয়োজন দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ব্যবস্থা।

প্রয়োজন সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।

প্রয়োজন রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে বাস্তব সমাধান।

কুষ্টিয়ার সেই শিশুটি, জামালপুরের সেই বৃদ্ধ, পঞ্চগড়ের সেই পরিবার—তারা কেউ আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলোয়াড় নয়। তারা কোনো দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেনি। তারা কেবল জীবনের স্রোতে ভেসে যাওয়া কিছু মানুষ।

আজ যদি ভারত ও বাংলাদেশ সত্যিই নিজেদের সভ্য, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত সীমান্তে আটকে থাকা মানুষগুলোর দুর্ভোগ কমানো।

কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সীমান্তের কঠোরতা দিয়ে নয়, মানুষের প্রতি আচরণ দিয়েই রাষ্ট্রকে বিচার করে।

আর সেই বিচারে বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে আজ একটাই প্রশ্ন—

তারা কি সীমান্তকে বড় করবে, নাকি মানুষকে? ভূ-সীমানার চেয়ে মানুষ বড়।

লেখক: পুলক ঘটক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles