তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংবিধানিক শাসনের ওপর আঘাতের অভিযোগ ঘিরে জবাবদিহির দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

তারা আজ আর ক্ষমতায় নেই। একসময় যারা রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তারা এখন একে একে নিজেদের দায় এড়ানোর ব্যাখ্যা সামনে আনছেন। কেউ বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের মতামত নেওয়া হয়নি। কেউ বলছেন, প্রকৃত ক্ষমতা ছিল একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে। কেউ দাবি করছেন, তারা অনেক কিছুই জানতেন না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি তাদের এই ব্যাখ্যা বিশ্বাস করবে?

কারণ ইতিহাস ইতোমধ্যে তাদের বিচার শুরু করে দিয়েছে।

আজ তারা জানেন, যে ক্ষমতার অহংকারে তারা দেশ চালিয়েছিলেন, সেই ক্ষমতা আর নেই। তারা জানেন, তাদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন এখন জনগণ করছে। আর সেই মূল্যায়নে তাদের ভূমিকা ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টিকে অনেকে এক অস্থির, অস্বাভাবিক এবং গভীর সংকটের সময় হিসেবে বিবেচনা করেন। এই সময়ে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে গভীরভাবে আঘাত করেছে।

এই সময়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্মারক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি ধ্বংস করা হয়। যে বাড়িটি শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনই ছিল না, বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটি উন্মত্ত জনতার হাতে ভেঙে ফেলা হয়। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রথম সরকারের স্মৃতিবাহী মুজিবনগর স্মৃতিসৌধও ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়।

তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা এসব ঘটতে দিয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করেনি, কেউ দায় স্বীকার করেনি। বরং এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিবাদী সংগঠন’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। অথচ একই সময়ে বিরোধী মতের মানুষের ওপর যে আচরণ করা হচ্ছিল, সেটিকেই অনেকেই প্রকৃত ফ্যাসিবাদের উদাহরণ হিসেবে দেখেন।

এই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালিত হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এই বিচার ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

দেশের গণমাধ্যমও এ সময় ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। বহু সাংবাদিক চাকরি হারান। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে হামলা, দখল এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নতুন নিয়োগের অভিযোগ ওঠে। যারা স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে চেয়েছেন, তাদের অনেকেই হয়রানি, ভয়ভীতি কিংবা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।

একই সময়ে রাজনীতিবিদ, বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনের সাবেক সদস্য, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়। তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ সময় জামিন ছাড়াই কারাগারে রাখা হয়।

আদালত চত্বরে বিব্রতকর দৃশ্যও দেখা গেছে। অভিযুক্তদের ওপর ডিম নিক্ষেপ, জুতা ছোড়া, গালিগালাজ—এসব ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটেছে। আইনজীবীদের একটি অংশও এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ অবনতির দিকে যায়। বহু পুলিশ সদস্য জনতার হামলায় নিহত হন। থানা-পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেওয়া হয়। অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুক্তির ঘটনা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরাও নিরাপদ ছিলেন না। সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের একাধিক বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

সমালোচকদের ভাষ্য, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই অপমানিত করা হয়েছিল।

আজ সেই সময়ের সঙ্গে যুক্ত অনেক ব্যক্তি নিজেদের দায় কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন, প্রকৃত সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হতো একটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা অঘোষিত ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে। তারা দাবি করছেন, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে তাদের কিছুই জানানো হয়নি।

কিন্তু সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন—তাহলে এতদিন তারা নীরব ছিলেন কেন?

তারা কি ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করেননি?

তারা কি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেননি?

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী যদি তারা সত্যিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে থেকেও থাকেন, তাহলে ক্ষমতায় থাকার নৈতিক বৈধতা কোথায় ছিল?

এই সময়ে বাংলাদেশের আইনের শাসন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থাও গভীর সংকটে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মানের যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে পড়ে বলে অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন।

সমালোচকদের মতে, একটি পুরো প্রজন্মকে শেখানো হয়েছে কীভাবে শিক্ষক, অভিভাবক, রাজনৈতিক নেতা এবং প্রবীণ নাগরিকদের প্রকাশ্যে অপমান করা যায়। সমাজের স্বাভাবিক মূল্যবোধ ও শ্রদ্ধাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রধান স্লোগান ‘জয় বাংলা’ একরকম নিষিদ্ধ ব্যাপার হয়ে যায়। জাতীয় পতাকা অবমাননার ঘটনাও দেশজুড়ে আলোচিত হয়।

অনেকের মতে, এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাতীয় চেতনাকে আঘাত করেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে বলে সমালোচকেরা মনে করেন। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক নানা টানাপোড়েনের মুখে পড়ে।

একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর উদ্যোগও বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের মতে, যে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই দেশের রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

সমালোচকদের আরও অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য নানা ধরনের প্রচারণা চালানো হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কিন্তু সময় বদলেছে।

সৈয়দ বদরুল আহসান

যারা একসময় মুহাম্মদ ইউনূসকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখতেন, তাদের অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। নাগরিক সমাজের একটি অংশ, যারা আগে সমর্থন জানিয়েছিল, তারাও এখন সেই সময়কার কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাবেক উপদেষ্টা ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত অনেক ব্যক্তি এখন নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত। কেউ বলছেন তারা জানতেন না, কেউ বলছেন তারা সিদ্ধান্ত নেননি, কেউ বলছেন তারা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন।

এই আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রবণতাকে অনেকেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে একটি ধারণা ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে যে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা ভবিষ্যতে আবারও রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসতে পারে। গত প্রায় দুই বছরে দলটির প্রতি জনসমর্থন বেড়েছে বলে তাদের সমর্থকেরা দাবি করছেন।

এই প্রেক্ষাপটে অনেকের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে কোনো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে। কে কী ভূমিকা পালন করেছেন, কোন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এসব বিষয়ে জবাবদিহির দাবি উঠতে পারে।

সমালোচকদের মতে, শুধু মুহাম্মদ ইউনূস নন, তার প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ তাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার দায় কেবল একজন ব্যক্তির নয়।

তাদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে খোলা আদালতে বিচার হতে হবে। প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করতে হবে। যারা অপরাধ করেছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর যারা নির্দোষ, তাদের নামও পরিষ্কার করতে হবে।

কারণ কোনো রাষ্ট্রই ষড়যন্ত্র, অস্থিতিশীলতা কিংবা সাংবিধানিক বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি চায় না।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দেশটি কি তার স্বাধীনতার মূল আদর্শে ফিরে যেতে পারবে?

১৯৭১ সালে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে, সেই রাষ্ট্র কি আবারও সেই আদর্শকে ধারণ করতে পারবে?

মূল কথা হলো, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসকে ভুলে গেলে চলবে না। যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোর রাজনৈতিক ও নৈতিক মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে গেলে একই ভুল আবার ফিরে আসে।

বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা হতে হবে সত্য উদঘাটন, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। আইনকে হতে হবে সবার জন্য সমান। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠা করতে হবে ন্যায়বিচার।

আর সবচেয়ে বড় কথা, স্বাধীনতার চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের মৌলিক রাষ্ট্রীয় আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হবে।

কারণ একটি রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ডের নাম নয়। একটি রাষ্ট্র একটি ধারণা।

আর সেই ধারণার নাম বাংলাদেশ।

লেখক: সৈয়দ বদরুল আহসান বাংলাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ক একাধিক গ্রন্থের লেখক।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles