ধর্ষণের মামলা থেকে বাঁচতেই শিবির নেতার ‘অপহরণ’ নাটক

বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের মামলা থেকে বাঁচতে দাউদকান্দির শিবির নেতা জিসানের আত্মগোপন, লাকসামে উদ্ধারের পর রহস্যভেদ।

কুমিল্লা: কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় এক নেতাকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রথমে এটিকে রাজনৈতিক বা জোরপূর্বক অপহরণ বলে দাবি করা হলেও, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটনার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক তরুণীকে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের অপরাধে দায়ের হওয়া মামলা থেকে বাঁচতেই ওই নেতা নিজেই আত্মগোপনে গিয়েছিলেন।

উদ্ধার হওয়া ওই যুবকের নাম জিসান আহমেদ প্রধান (২৮)। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক এবং কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি। গত শুক্রবার রাতে লাকসাম রেলওয়ে জংশন থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়।

নিখোঁজ সংবাদ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা

ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন, ২০২৬) রাতে। জিসান আহমেদ প্রধান দাউদকান্দি মডেল মসজিদে এশার নামাজ আদায় করার পর থেকে আর বাড়ি ফেরেননি। রাত ৮টার পর থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে শুক্রবার সকালে দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

এদিকে জিসানের নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়লে শুক্রবার বিকেলে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা দাউদকান্দিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দাউদকান্দি মডেল মসজিদ থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়, যা পৌর বাজার বড় মসজিদের সামনে গিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশে রূপ নেয়। সমাবেশে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম এবং কুমিল্লা উত্তর জেলা শিবিরের সভাপতি শাকিল আদনানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। তারা অভিযোগ করেন, জিসানকে পরিকল্পিতভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে এবং অবিলম্বে তার মুক্তির দাবি জানান।

রেলওয়ে জংশন থেকে উদ্ধার ও জিসানের বক্তব্য

শুক্রবার রাত ১০টার দিকে লাকসাম রেলওয়ে জংশনে এক যুবককে মুমূর্ষু ও অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেন। লাকসাম ক্রসিং থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য তাকে প্রথমে লাকসামের একটি ক্লিনিকে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জিসান আহমেদ প্রথমে অপহরণের গল্প সাজানোর চেষ্টা করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন:

“বৃহস্পতিবার রাতে এশার নামাজ শেষ করে আমি দাউদকান্দি মডেল মসজিদের সামনের সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ একটি গাড়ি আমার সামনে এসে থামে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ি থেকে কয়েকজন লোক নেমে আমাকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে গাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়। এরপর আমাকে কোনো চেতনানাশক দেওয়া হয়েছিল হয়তো, কারণ তারপর থেকে আমি আর কিছু বলতে পারছি না বা মনে করতে পারছি না।”

থলের বিড়াল বের করল পুলিশ: নেপথ্যে ধর্ষণ ও গর্ভপাত

জিসানের এই নাটকীয় দাবির পর তদন্তে নামে কুমিল্লা জেলা পুলিশ। আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্তকারীরা দেখতে পান যে, অপহরণের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। শনিবার (১৩ জুন) জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করে পুরো ঘটনার আসল সত্য প্রকাশ করা হয়।

পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জিসানকে কেউ অপহরণ করেনি, বরং তিনি আইনি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বাঁচতে স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেছিলেন।

ঘটনার নেপথ্যের বিবরণ দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ২০ মে জিসান দাউদকান্দির একটি ভাড়া বাসায় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ২৫ বছর বয়সী এক তরুণীকে ধর্ষণ করেন। পরবর্তী সময়ে ওই তরুণী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জিসান তাকে বিভিন্ন ওষুধ খাইয়ে জোরপূর্বক গর্ভপাত করান। এরপর থেকে ওই নারী বিয়ের জন্য ক্রমাগত চাপ দিতে থাকলে জিসান অবশেষে ১২ জুন (শুক্রবার) তাকে বিয়ে করবেন বলে সম্মতি জানান।

কিন্তু বিয়ের নির্ধারিত দিনের আগের রাতে অর্থাৎ ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) জিসান বিয়ের পিঁড়িতে না বসার জন্য এবং ঝামেলা এড়াতে নিজেই নিখোঁজ হওয়ার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং তার চাচাতো ভাই রাসেল আহমেদকে দিয়ে থানায় নিখোঁজের নাটক সাজিয়ে জিডি করান। এদিকে জিসান উদ্ধার হয়েছেন শোনার পর, ভুক্তভোগী তরুণী শুক্রবার রাতেই দাউদকান্দি মডেল থানায় হাজির হয়ে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

প্রশাসনের বক্তব্য

শনিবার দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান এই প্রতিবেদকের কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন:

“নিখোঁজ দাবি করা শিবির নেতাকে আমরা সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেছি। তাকে কেউ অপহরণ করেনি। মূলত এক নারীর সঙ্গে প্রতারণামূলক সম্পর্কের জেরে এবং তার আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে সে নিজে থেকেই আত্মগোপনে ছিল। ওই নারী ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে দাউদকান্দি মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি নিয়মিত মামলা করেছেন, যেখানে ভ্রূণ নষ্ট করাসহ বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।”

অন্যদিকে লাকসাম ক্রসিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী কামরুন্নাহার লাকী শনিবার সকালে জানান:

“স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জিসান আহমেদ প্রধানকে লাকসাম রেলওয়ে জংশন থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করি। মানবিক কারণে প্রথমে তাকে হাসপাতালে পাঠানো নিশ্চিত করা হয়েছে। যেহেতু তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে মূল অভিযোগটি দাউদকান্দি মডেল থানায় হয়েছিল, তাই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ এবং মামলার তদন্ত দাউদকান্দি পুলিশই পরিচালনা করছে।”

দাউদকান্দি মডেল থানা পুলিশ জানিয়েছে, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পরপরই জিসানকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হবে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles