মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার দত্তগ্রাম সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মুজিবুর রহমান নামের এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মনু নদী এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পরিবারের মাঝে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত মুজিবুর রহমান দত্তগ্রাম এলাকার অজিব উল্লাহর ছেলে। তার বয়স আনুমানিক ২০ বছর। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তরফ থেকে দুটি ভিন্ন দাবি সামনে এসেছে।
মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ নাকি চোরাচালান?
স্থানীয় সূত্র এবং নিহতের পরিবারের দাবি, শুক্রবার বিকেলে মুজিবুর রহমান সীমান্তের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মনু নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। নদীটি ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা ঘেঁষে প্রবাহিত হওয়ায় সেখানে কোনো কাঁটাতারের স্পষ্ট বেড়া নেই। অসাবধানতাবশত বা ভুলবশত তিনি ভারতীয় সীমানার ভেতরে কিছুটা প্রবেশ করে ফেললে বিএসএফ সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউপি সদস্য জয়নুল ইসলাম এই বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানান:
“গুলিতে মুজিবুর রহমান মারা গেছেন—এমনটি তার স্বজনরা আমাকে নিশ্চিত করেছেন। ঘটনার পর বিএসএফ তার মৃতদেহ নিয়ে গেছে। বর্তমানে লাশটি ভারতের ত্রিপুরার উনকোটি জেলা হাসপাতালে রাখা আছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।”
অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনার পরপরই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পরিস্থিতি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। বিজিবির দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়:
“শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলাধীন দত্তগ্রাম সীমান্ত এলাকা দিয়ে ৬-৭ জনের একটি বাংলাদেশি চোরাকারবারি দল অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করে। ভারতীয় চোরাকারবারিদের সহায়তায় চোরাচালানি মালামাল আনার উদ্দেশ্যে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে আনুমানিক ৫০০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে লখাইরচর নামক স্থানে প্রবেশ করে। এ সময় টহলরত বিএসএফ সদস্যরা তাদেরকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানে বাধা প্রদান করেন। কিন্তু বাংলাদেশি চোরাকারবারিরা পিছু না হটে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বিএসএফ সদস্যদের ওপর আক্রমণের প্রচেষ্টা চালায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার্থে বিএসএফ সদস্যরা ২-৩ রাউন্ড ফায়ার করলে ঘটনাস্থলেই একজন চোরাকারবারি গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে।”
প্রশাসন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বক্তব্য
ঘটনার পর কুলাউড়া থানা পুলিশ এবং শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি) দ্রুত সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করে এবং তদন্ত শুরু করে। কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন:
“সীমান্তে গুলির ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। আমরা স্থানীয়ভাবে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি।”
এই বিষয়ে শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানান:
“সীমান্তে গুলির ঘটনার খবর আমরা পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তবে এই যুবক আসলেই নিহত হয়েছেন কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে কূটনৈতিক ও ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের প্রক্রিয়া চলছে।”
মৌলভীবাজারের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার (এসপি) আসিফ মহিউদ্দিনও গুলির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কুলাউড়া দত্তগ্রাম সীমান্তে গুলির খবর পাওয়ার পর জানা গেছে যে বিএসএফ ওই যুবককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ভারতীয় হাসপাতালে নিয়ে গেছে।
লাশ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া
সীমান্তে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিজিবি ও বিএসএফ-এর মধ্যে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের প্রস্তুতি চলছে। আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভারতের ত্রিপুরা থেকে মুজিবুর রহমানের মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য নিহতের পরিবার এবং স্থানীয় প্রশাসন বিজিবির মাধ্যমে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বারবার সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার জন্য আহ্বান জানালেও, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এই ধরনের মৃত্যুর ঘটনা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

