বাংলাদেশে কি একটি নীরব গণহত্যা চলছে?

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং নবজাতক শিশুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নিপীড়ন ও অবহেলার ধারাবাহিকতাকে গণহত্যার আধুনিক রূপ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

গণহত্যা শব্দটির সাথে মানুষ কম বেশী পরিচিত। শব্দটি জাতিসংঘ সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছে ‘কোন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলকে পরিকল্পিত ভাবে নির্মূল করার জন্য হত্যাকণ্ড চালানো।’ এই হত্যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষও হতে পারে। যেমন কোন একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে শিশু জন্মে বাধা দেয়া বা নবজাতককে হত্যা করা কিংবা কোন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিকেই হত্যা করা। গণহত্যা যুদ্ধের সময়ও হতে পারে যেমন বাংলাদেশে একাত্তরের গণহত্যা বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে জামার্নিতে হিটলারের নাৎসি বাহিনী ইহুদিদের উপর যেমনটা চালিয়েছিল। আবার ‘শান্তি’র সময়ও হতে পারে। ১৯৯৪ সালে আফ্রিকার রুয়ান্ডাতে গৃহযুদ্ধের সময় ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই সব ধর্ষণের ফলশ্রুতিতে যেনো কোন শিশুর জন্ম না হয় ধর্ষকরা সে দিকে খেয়াল রেখেছে। কোন শিশু জন্ম নিলে তাকে হত্যা করেছে। ইরাক আর সিরিয়াতে যেনো ইয়াজেদি জনগোষ্ঠীর বিস্তার না ঘটে তার জন্য সে সব দেশে সরকারি ভাবে নানা রকমের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সাথেও জান্তা গোষ্ঠী এমন ভয়াবহ আচরণ করেছে। সুতরাং গণহত্যা যে শুধু সরাসরি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে শারীরিক ভাবে হত্যা তা বুঝায় না। অন্য ভাবেও হতে পারে। এই সব কথা জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদে উল্লেখ আছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালিদের উপর একটি গণহত্যার পর বাংলাদেশে আর একটি গণহত্যা এই দেশে বর্তমানে চালু আছে তা হয়তো এখন অনেকে বুঝতে পারছেন না। সেই গণহত্যার শিকার মূলত নির্দিষ্ট চারটি গোষ্ঠী। প্রথম ধর্মীয় সংখ্যালঘু সনাতন ধর্মাবলম্বী, দ্বিতীয় আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট যে কোন ব্যক্তি, তৃতীয়ত মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান, আর সর্বশেষ দেশের নবজাতক শিশু। ২০২৪ সালের আগস্টের পাঁচ তারিখের তথাকথিত জুলাই অভ্যুত্থানের (আসলে জঙ্গি  অভ্যুত্থান) পরপর কথিত জুলাই যোদ্ধাদের সরাসরি আক্রমণের স্বীকার হন দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। পাঁচ তারিখ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে কোন কার্যকর সরকার ছিল না। এই সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় এই আক্রমণ পরিচালনা করার জন্য সৃষ্টি হয় মব বা সঙ্গবদ্ধ সন্ত্রাসী দল। এই দলে প্রধানত ছিল জামায়াতে ইসলাম ও তাদের অঙ্গ সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের নেতা কর্মিরা, সাথে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্য আর বিএনপি আর ছাত্র দলের সদস্যরা। পাঁচ দিন পর ফ্রান্স থেকে উড়ে এসে ড. ইউনুস ক্ষমতা দখল করার পর ধারণা করা হয়েছিল পরিস্থিতির উন্নতি হবে। হলো উল্টো। তিনি এই মব সংষ্কৃতিকে বৈধতা দিলেন। তার সভা পারিষদের সদস্যরা জানালেন যা হচ্ছে তা মব বলা যাবে না, তারা হচ্ছে ‘প্রেশার গ্রুপ’। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মব নামক এই সব দূর্বৃত্তরা বেছে বেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ীঘরে হামলা করে তা ধ্বংস করলো, পুরুষদের পিটিয়ে বা গাছের সাথে ঝুলিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারলো। বাড়ীর মেয়েদের ধর্ষণ করলো। বেঁচে থাকা মানুষদের অনেকেই গ্রাম ছাড়া হলো। কেউ কেউ দেশান্তরি। এদের মধ্যে যেমন ছিল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তেমন ছিল শিক্ষক, ডাক্তার বা অন্য পেশার মানুষও। সরকারি চাকুরিতে থাকা অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চাকুরি হারালেন। রাজশাহী’র সারদা পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণরত তিনশত ক্যাডেটকে তাদের শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানের ঠিক আগমূহূর্তে ছাঁঠাই করা হয়। এদের বেশীর ভাগই হয় আওয়ামী পরিবারের সন্তান অথবা ধর্মীয় সংখ্যালঘু।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিপিড়নের সাথে সাথে দুর্বৃত্তরা ঝাঁপিয়ে পরলো আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের উপর। পরিবারের কেউ একজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে শুধু জড়িত থাকার ‘অপরাধে’ সেই পরিবারের সকলে এই দুর্বৃত্তদের শিকারে পরিণত হলো। নূতন একটি শব্দের জন্ম হলো। ‘স্বৈরাচারের দোসর’। এই দোসরের তালিকা হতে বাদ গেলো না বিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক চিকিৎসক বা অন্য অনেক পেশার মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে তাদের না পেয়ে তাদের পরিবার আক্রমণের শিকার হলো। বাদ গেলো না মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের অপরাধ তারা পাকিস্তান ভেঙ্গেছে। এক সময় যে মানুষ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে গর্বিত হতো সে মানুষ আত্মগোপনে গেল। যে সকল পরিবার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেত তারা নিজের ভিটে মাটি হতে উচ্ছেদ হয়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হলো।

সব শেষে ইউনুস সরকারের ভয়ানক অবহেলার কারণে হামের টিকার অভাবে দেশে হামের মহামারির প্রাদূর্ভাব আর তার ফলে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত ও তাদের মৃত্যু। সরকারি হিসাব মতে এই পর্যন্ত প্রায় সাত শতের বেশী শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে। বেসরকারিভাবে তা হাজারের উপর হতে পারে। বাংলাদেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ দেশগুলোতে কিছু রোগ আছে যা অন্য দেশে তেমন দেখা যায় না। এর মধ্যে আছে কলেরা, গুটি বসন্ত, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, টায়ফয়েড, চিকনগুনিয়া, কালাজ্বর ইত্যাদি। এর অধিকাংশই পানিবাহিত। এক সময়ে এই সব রোগে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ আক্রান্ত হতো এবং গ্রামের পর গ্রাম এই মহামারির কারণে উজার হয়ে যেতো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে দেশের অনেক এলাকায় গুটি বসন্তে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। মৃত মানুষের দাফন কাফনের মানুষ পর্যন্ত ছিল না।

বিভিন্ন সময়ে সরকারের সমন্বিত কর্মসূচির ফলে হামসহ এই সব রোগ বাংলাদেশ হতে প্রায় বিদায় নিয়েছিল। এই সফলতা একক কোন সরকারের কৃতিত্ব বলা যাবে না। তবে এই কৃতিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে বিগত দিনে শেখ হাসিনা সরকারের সময়। দেশে টিকাদান কর্মসূচিতে তিনি কতটুকু সফল হয়েছিলেন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ কোভিড প্রাদূর্ভাবের সময় বাংলদেশে পরিকল্পিত টিকাদান কর্মসূচি। বিশ্বের দেশে দেশে যখন এই মহামারির কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সেখানে বাংলাদেশে এই মৃত্যুর সংখ্যা ২৯ হাজার পাঁচশ। ভারতে ৫ লক্ষ তেত্রিশ হাজার আর যুক্তরাষ্ট্রে বার লক্ষ। কোভিড নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের সাফল্য ছিল শীর্ষে। এই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

এবার আসি দেশে চলমান হাম জনিত রোগের মহামারি বিষয়ে। হাম মূলত শিশুদের রোগ হলেও তা বড়দেরও হতে পারে। সর্বশেষ এই রোগটির দেশব্যাপি প্রাদূর্ভাব দেখা গিয়েছিল ২০০০-২০০৬ সাল মেয়াদে। এই সময় বেগম জিয়ার সরকার ক্ষমতায়। ২০০৭ সাল থেকে রোগটির প্রাদূর্ভাব কমতে থাকে। তখন এক এগারোর সরকার। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর তিনি এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেন। তাকে সহায়তা করার জন্য জাতিসংঘ এগিয়ে আসে। গ্যাবি (গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস এন্ড ইমিউনাইজেশন) এর অর্থায়নে ইউনিসেফ বিশ্বের বিভিন্ন টিকা উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠান হতে টিকা সংগ্রহ করে তা বাংলাদেশ সরকারকে হস্তান্তর করে। অর্থায়নে বাংলাদেশও সম্পৃক্ত ছিল। সহয়াতা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা। সরকার সারা দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে তা বিতরণ করে শিশুদেরও টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করে। একই সময় সারা দেশে জনগণকে এই বিষয়ে সচেতন করার জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচারণা চালায়। কোন কোন অঞ্চলে মাইকিং এর ব্যবস্থা করে। শেখ হাসিনার পনের বছরের শাসনামলে এই কর্মসূচি বিরাট সাফল্য লাভ করে। ২০১৯ সালে এই সাফল্যের জন্য ইউনিসেফ ও গ্যাভি যৌথ ভাবে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে তাঁকে এক বিরল সম্মাননায় ভূষিত করে। তাকে দেয়া হয় ‘ভ্যাকসিন হিরো’ খেতাব। প্রাপ্ত তথ্য হতে দেখা যায় ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশে শিশুদের এই গণটিকা দেয়ার কর্মসূচি অব্যাহত ছিল।

২০২৪ এর পর তথাকথিত জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্যারিস থেকে উড়ে এসে ড. ইউনুসঅবৈধ ভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ১৭ তারিখ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে আওয়ামী লীগ বিহীন একটি সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে। আর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে একটি ‘নির্বাচিত’ সরকার গঠিত হয়। ইউনুসের শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কাল অধ্যায়। নিজের স্বার্থে এমন কোন অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। তবে সব অপকর্মের অন্যতম ছিল প্রতিষ্ঠিত হামের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়া। সিদ্ধান্ত নিলেন প্রচলিত নিয়মে গ্যাভির মাধ্যমে আর টিকা সংগ্রহ করা হবে না। হবে উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে। হয়তো মাথায় ছিল তিনি নিজেই গ্রামীণের নামে একটি সংস্থা খুলে তার মাধ্যমে তা সংগ্রহ করবেন। এটি ছিল একটি সর্বনাশা সিদ্ধান্ত। একই সাথে তিনি এই বিদ্যমান টিকাদান কর্মসূচির সাথে যারা জড়িত ছিল তাদের বেতন বন্ধ করে দিলেন।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের স্থায়ী প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ারস অন্তত পাঁচবার ইউনুসকে চিঠি দিয়ে তার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেন ‘অনুগ্রহ করে এমন সর্বনাশা সিদ্ধান্ত নেবেন না’। কে শোনে কার কথা। এরই মধ্যে দেশে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়তে লাগল। তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার পর এই সমস্যা মহামারি আকার ধারণ করলো। এখন হয়তো সরকার কিছুটা ভাল অবস্থায় ফিরে গেছে। কিন্তু হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সিট নেই। দেশে ইউনুসের নানাবিধ অপকর্ম নিয়ে একাধিক ব্যক্তি বিচারের আশায় আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দেশের কোন আদালতে ইউনুসের কোন বিচার হবে না। বলতে বাকি রেখেছেন ‘উপরের মহলের অনুমতি নেই’। দেশে মানুষ এতদিনে জেনে গেছে তারেক রহমানের সরকার ইউনুস সরকারের একটি বর্ধিত সংষ্করণ। বুঝতে হবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেও আদালতের কাটগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল।

উপরের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে এটি পরিষ্কার যে জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী ড. ইউনুস বাংলাদেশে তার অবৈধ শাসনকালে দেশে অনেক অপকর্ম করেছেন। দেশে একাধিক গণহত্যার সাথে শরিক হয়েছেন। দেশে প্রচলিত আদালতে হয়তো তার কোন বিচার হবে না তবে ইতিহাস তাকে মূল্যায়ন করবে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ১০ জুন, ২০২৬।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles