যশোরের চৌগাছায় যুবলীগের এক নেতাকে আজ কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত জুয়েল আহমেদ রানার পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনার মর্মন্তুদ বর্ণনা দিয়ে জানিয়েছেন সরকারি দল বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা সর্বসমক্ষে এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। তবে বিএনপি’র স্থানীয় একজন নেতা হত্যার দায় অস্বীকার করেছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে যশোরের চৌগাছা উপজেলার মুক্তদাহ গ্রামে হামলার শিকার হন জুয়েল আহমেদ রানা (৪০)। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নিহত জুয়েল আহমেদ রানা উপজেলার মুক্তদাহ গ্রামের বাসিন্দা এবং পাতিবিলা ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। চলতি বছরের জাতীয় নির্বাচনের পর তিনি এলাকায় ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে মুক্তদাহ মোড়ে স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ আলী ওরফে ‘কসাই’-এর সঙ্গে জুয়েল রানার কথা-কাটাকাটি হয়। পরে সেই বিরোধকে কেন্দ্র করে একদল ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়ি মারধর ও কুপিয়ে গুরুতর জখম করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, দিনের আলোয় জনসমক্ষে সংঘটিত এই হামলার সময় আশপাশের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। গুরুতর আহত জুয়েল রানাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
জুয়েল আহমেদ রানার স্ত্রী মায়া বেগম ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “সকালে তিনি মেয়েকে স্কুলে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর আগে স্থানীয় মোড়ে চা খেতে গিয়েছিলেন। সেখানেই তার ওপর হামলা চালানো হয়। যারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।”
পরিবারের সদস্যরাও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, হামলাকারীরা প্রকাশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং স্থানীয় লোকজন ঘটনার সাক্ষী।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, পাতিবিলা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ও ইউপি সদস্য নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে হামলাটি সংঘটিত হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম বলেন, “আমার জানা মতে, স্থানীয় জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে জুয়েল রানা খুন হয়েছেন। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা নজরুল ইসলামের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
পুলিশও প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছে। চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদ বলেন, “ইউসুফের সঙ্গে জুয়েলের আগে থেকেই বিরোধ ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সেই বিরোধের জের ধরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।”
তবে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের একাংশ পুলিশের এই প্রাথমিক ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাদের দাবি, নিহত জুয়েল রানা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার এবং হয়রানির অভিযোগ নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো ব্যক্তি হামলার শিকার হয়েছেন কি না, তা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে জুয়েল আহমেদ রানার মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তার স্বজন ও সমর্থকরা।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত এক স্বজন বলেন, “আমরা শুধু বিচার চাই। যারা তাকে প্রকাশ্যে হত্যা করেছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

