কুষ্টিয়া — প্রচণ্ড তাপদাহে ফেটে চৌচির হওয়া এক টুকরো ফসলি জমি। মাথার ওপর তপ্ত সূর্য আর নিচে ধূ ধূ ধুলোবালি। তারই মাঝে মায়ের বুক ঘেঁষে কাঁদছে মাত্র দেড় বছরের এক অবুজ শিশু। সে একা নয়; তার সঙ্গে রয়েছেন চারজন নারী, চারজন পুরুষ এবং আরও তিনটি শিশু। এই ১২ জন মানুষ এখন আর কেবল কোনো ব্যক্তি নন, তারা যেন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যকার এক স্নায়ুযুদ্ধের নীরব সাক্ষী। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ‘পুশ-ব্যাক’ এবং ‘পুশ-ইন’ রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের ‘শূন্যরেখায়’ (নো-ম্যানস ল্যান্ড) কাটছে তাদের বন্দি জীবন।
খোলা আকাশের নিচে, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা তীব্র গরমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাটছে তাদের প্রতিটা মুহূর্ত। এক পক্ষ তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে, অন্য পক্ষ তাদের দেশের সীমানায় ঢুকতে দিচ্ছে না। এই চরম অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের মধ্যে প্রাগপুর সীমান্তের ৪৮ নম্বর পিলারের কাছে যেন থমকে গেছে মানবতা।
ঘটনার সূত্রপাত একটি শুক্রবার ভোরে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এই ১২ জনকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) চেষ্টা করে। তারা বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করলে বিষয়টি টের পেয়ে যান স্থানীয় গ্রামবাসীরা। তড়িঘড়ি করে খবর দেওয়া হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি)। এরপর বিজিবি ও স্থানীয়দের সম্মিলিত তৎপরতায় তাদের পুনরায় সীমান্তের শূন্যরেখায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সেই থেকে গত কয়েকদিন ধরে এই শূন্যরেখাই হয়েছে তাদের ঠিকানা। তবে ভূরাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় আইনি লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশিরা দেখিয়েছেন অনন্য এক মানবিকতা। মাথার ভাঙ্গা নদীর ওপরের নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে অনেক গ্রামবাসী নিজেদের উদ্যোগে এই অসহায় মানুষগুলোর জন্য খাবার পানি ও সামান্য শুকনো খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। কিন্তু এই ভালোবাসার আড়ালেও তাড়া করে ফিরছে এক গভীর আতঙ্ক—কী হবে তাদের ভবিষ্যৎ?
পতাকা বৈঠক নিয়ে টানাপোড়েন ও সীমান্তের বাস্তব চিত্র
সীমান্তের এই জটিল পরিস্থিতি নিরসনে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বারবার থমকে যাচ্ছে। সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ে পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও বিএসএফের অনাগ্রহ বা নানা অজুহাতে তা পিছিয়ে যাচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক জটিলতা এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় কথা বলেন বিজিবি-৪৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি। তিনি পরিস্থিতির তীব্রতা তুলে ধরে বলেন:
“আমরা সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা বজায় রেখেছি। প্রায়ই দেখা যায়, বিএসএফ রাতের অন্ধকারে, বিশেষ করে সীমান্তের আলো নিভিয়ে দিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মানুষদের এপারে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। আমরা এই নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান এবং এর পেছনে থাকা কূটনৈতিক প্রোটোকলগুলো খতিয়ে দেখতে জরুরি পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু ওপারের সীমান্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো চূড়ান্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। যতক্ষণ না পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিক কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসছে, ততক্ষণ নিয়মতান্ত্রিক কারণেই এই ১২ জনকে সীমান্তের শূন্যরেখাতেই থাকতে হচ্ছে।”
প্রাগপুর সীমান্তের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। শুক্রবার ভোরে এই ঘটনার পর থেকে দৌলতপুর সীমান্তের ধর্মদহসহ আরও কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে নতুন করে পুশ-ইনের জন্য বিএসএফ জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে বিজিবি এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের যৌথ নজরদারি ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে তাদের সেই চেষ্টা সফল হতে পারেনি। রাতের অন্ধকারে এই তৎপরতা আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় পুরো সীমান্তজুড়ে এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে।
একটি গভীর ও বিস্তৃত সংকট: পরিসংখ্যানের আড়ালে মানুষের গল্প
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ৪,০৯৬ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ সীমান্ত অঞ্চলটি পৃথিবীর অন্যতম জটিল এবং সংবেদনশীল একটি সীমানা। মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্তে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক পুশ-ইনের চেষ্টা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত মাত্র কয়েক মাসে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত চেষ্টা চালানো হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটস (আইএসএইচআর)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি দেশেরই তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার আইনগত অধিকার রয়েছে, কিন্তু তা কখনোই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মৌলিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে হওয়া উচিত নয়। এদিকে সীমান্ত এলাকায় সাধারণ নাগরিকদের ওপর বিএসএফের গুলি চালানো এবং প্রাণহানির ঘটনাও কমেনি, যা দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্ককে প্রায়শই বেশ উত্তপ্ত করে তোলে।
দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বা সীমান্ত সমন্বয় সম্মেলনগুলোতে সবসময়ই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, সীমান্ত হবে শান্তির, কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ বা অবৈধ পুশ-ইন করা হবে না। মানবপাচার রোধ এবং আইনি উপায়ে অপরাধী প্রত্যর্পণের কথাও বলা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের নির্মম বাস্তবতা হলো, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক আলোচনা বা ক্ষমতার প্রদর্শন প্রায়শই সীমান্তের এই সাধারণ ও দরিদ্র মানুষগুলোর ওপর এসে আছড়ে পড়ে।
আইনি মারপ্যাঁচে উপেক্ষিত মানবতা
রাজনীতিবিদেরা অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ক করবেন, সামরিক কর্মকর্তারা হয়তো সীমান্ত সুরক্ষার কৌশল সাজাবেন—কিন্তু মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি হারিয়ে যাচ্ছে, তা হলো মানুষের প্রতি মানুষের ন্যূনতম করুণা বা মানবিক মর্যাদা।
সীমান্তের দুই পাড়ের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাই এখন সোচ্চার হচ্ছেন এই অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে। তারা বলছেন, দরিদ্র বা ছিন্নমূল মানুষদের এভাবে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া, আইনগত প্রক্রিয়া না মেনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছুড়ে ফেলার এই খেলা বন্ধ হওয়া দরকার। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা নাগরিক সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী ঢাকার একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন:
“সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা এই মানুষগুলো আসলে রাষ্ট্র ও শক্তির এক নিষ্ঠুর দড়িটানাটানি খেলার শিকার। আমরা এক অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যেখানে সামান্যতম মানবিক সহানুভূতিও হারিয়ে যাচ্ছে। অবুজ শিশু, অসহায় নারী কিংবা দিনমজুর পুরুষদের এভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চরম অন্যায়। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু তা মানুষের জীবনের বিনিময়ে হতে পারে না। এই মানুষগুলোকে সবার আগে একজন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে, কোনো রাজনৈতিক বিরোধের বা সুরক্ষার গুটি হিসেবে নয়।”
আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া বা তার নাগরিকত্ব নিশ্চিত না করে জোরপূর্বক অন্য কোনো দেশের সীমানায় ঠেলে দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পুশ-ইনের কারণে এই মানুষগুলো তাদের মৌলিক অধিকার থেকে তো বঞ্চিত হচ্ছেনই, পাশাপাশি তাদের জীবন প্রচণ্ড ঝুঁকিতে পড়ছে। কুষ্টিয়ার এই প্রাগপুর সীমান্তেই যেমন এই অসহায় পরিবারগুলোকে তীব্র তাপপ্রবাহের মাঝে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাতে হচ্ছে, যা যেকোনো সুস্থ সমাজব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক।
মাথাবাঙ্গা নদীর ওপর দিয়ে যখন গোধূলির আলো এসে পড়ে প্রাগপুর সীমান্তের ৪৮ নম্বর পিলারের ওপর, তখনো একবুক শঙ্কা আর চোখে একরাশ শূন্যতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে নো-ম্যানস ল্যান্ডের সেই চার শিশু। তাদের জানা নেই তাদের অপরাধ কী, কিংবা তাদের পরবর্তী গন্তব্য কোথায়। এই সংকটের আশু সমাধান হয়তো হবে, কিন্তু সীমান্তজুড়ে ক্ষমতার এই লড়াইয়ে আর কত মানুষকে এমন করে ঠিকানাহীন হয়ে বাঁচতে হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরাই থেকে গেছে।

