যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিতের ঘটনার জেরে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে টহলরত একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। এই ঘটনার পরই ওয়াশিংটন সামরিক জবাব দেয়, যা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতাকে আরও গভীর করেছে এবং সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার মার্কিন হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবিসি নিউজকে বলেন, “আমার বিশ্বাস, এর জবাব খুবই শক্তিশালী ও কঠোর হওয়া উচিত। আর আমরা ঠিক সেটাই করেছি।”
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার দিকে হামলা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানায়, “এই অভিযান ইরানের অযৌক্তিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া।”
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে হামলা হয়েছে। প্রণালির তীরবর্তী সিরিক শহরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলেও তারা নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি বন্দর আব্বাস ও জাস্ক এলাকার কাছাকাছি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানানো হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, হামলায় হরমুজ প্রণালির আশপাশে অবস্থিত ইরানের কয়েকটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রাডার স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিতের ঘটনা
ট্রাম্পের দাবি, ইরানের একটি একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন মার্কিন সেনাবাহিনীর অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটিকে ভূপাতিত করে। তবে হেলিকপ্টারে থাকা দুই পাইলটই প্রাণে বেঁচে যান।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওমান উপকূলের কাছে মঙ্গলবার ভোররাতে নিয়মিত টহলরত অবস্থায় হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। পরে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর সারফেস ড্রোন দুই ক্রুকে উদ্ধার করে। উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন হতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে।
যদিও ট্রাম্প দাবি করেন, “পাইলটরা পুরোপুরি ভালো আছেন”, তবে সেন্ট্রাল কমান্ড আরও সতর্ক ভাষায় জানায়, উদ্ধার হওয়া দুই সেনাসদস্যের অবস্থা স্থিতিশীল।
ঘটনাটি নিয়ে ট্রাম্প পরে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এটা খুব বড় কোনো বিষয় ছিল না। পাইলট ঠিক আছে।”
তবে একই সঙ্গে তিনি সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
ইরানের পাল্টা সতর্কবার্তা
মার্কিন হামলার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কঠোর বার্তা দেন।
তিনি লিখেছেন, “ইরান কোনো হামলা বা হুমকির জবাব ছাড়া রাখবে না।”
আরেকটি পোস্টে তিনি সরাসরি হেলিকপ্টার ঘটনার উল্লেখ না করলেও বলেন, অঞ্চলে অবস্থানরত বিদেশি বাহিনী দুর্ঘটনা বা গোলাগুলির মধ্যে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আরাঘচি লেখেন, “ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাদের এই অঞ্চল ত্যাগ করা।”
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সামরিক সূত্রের বরাতে দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আক্রমণাত্মক বিমান অভিযান পরিচালিত হয়নি।
তবে একই সূত্র সতর্ক করে জানিয়েছে, “শত্রুপক্ষ যদি নতুন করে শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তার জবাব হবে সিদ্ধান্তমূলক।”
শান্তি প্রচেষ্টা নতুন সংকটে
সাম্প্রতিক এই সংঘাত এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করে আসছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে উভয় পক্ষই আলোচনার মাধ্যমে বৃহত্তর সংঘাতের অবসানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির খুব কমই দেখা গেছে।
হেলিকপ্টার ভূপাতিতের ঘটনা সেই নাজুক কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
বর্তমানে ইরান অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর বিভিন্ন ধরনের অবরোধ আরোপ করেছে।
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট মঙ্গলবার বলেন, “হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল অর্থবহ হারে বাড়ছে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ শেষ হলেও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে “অনেক মাস সময় লাগতে পারে।”
সমঝোতার পথে প্রধান বাধা
ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, যেকোনো শান্তি চুক্তিতে ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থেকে বিরত থাকতে হবে।
অন্যদিকে তেহরানের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা শত শত কোটি ডলারের সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি।
এই মৌলিক মতপার্থক্যই এখনো দুই পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
লেবাননেও রক্তক্ষয়ী হামলা
এদিকে একই সময়ে আরেকটি সংঘাত নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক বন্দরনগরী টাইরে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন।
মার্চ মাসে হিজবুল্লাহর রকেট হামলার পর লেবাননে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর টাইর শহরে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা বলে মনে করা হচ্ছে।
রয়টার্স যাচাই করা একটি ভিডিওতে হামলার পর সড়কে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে।
ইসরায়েল বলছে, লেবাননে তাদের অভিযান ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির আলোচনার অংশ নয় এবং এটি আলাদা নিরাপত্তা ইস্যু। অন্যদিকে হিজবুল্লাহও তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে।
চলতি সপ্তাহেই ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলায় তেহরানে অন্তত দুইজন নিহত হন।
তেহরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি করতে হলে আগে লেবাননে সংঘাত বন্ধ হতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সামরিক সংঘাত, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন অবনতি—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আবারও বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই পথকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

