২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ, ইতিহাস গড়লেন মিরাজরা

নাহিদ রানার আগুনঝরা বোলিং ও মোসাদ্দেকের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ডিএলএস পদ্ধতিতে ৮৬ রানের বড় জয় টাইগারদের।

দীর্ঘ ২১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে স্মরণীয় এক জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৫ সালে কার্ডিফে রিকি পন্টিংয়ের শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর এই প্রথম আবারও ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তিকে পরাজিত করল টাইগাররা।

মঙ্গলবার মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃষ্টি-বিঘ্নিত প্রথম ওয়ানডেতে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে ৮৬ রানের বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। তিন ম্যাচের সিরিজে এর ফলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিকাশ, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সামর্থ্যেরও প্রতীক। বিশেষ করে তরুণ গতিতারকা নাহিদ রানার আগুনঝরা বোলিং এবং প্রায় চার বছর পর জাতীয় দলে ফিরে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের অসাধারণ অলরাউন্ড নৈপুণ্য জয়টিকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।

ব্যাট হাতে বাংলাদেশের শক্ত ভিত

টস জিতে বাংলাদেশকে আগে ব্যাটিংয়ে পাঠান অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক জশ ইংলিস। শুরুতে সাইফ হাসানের উইকেট হারালেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।

দ্বিতীয় উইকেটে নাজমুল হোসেন শান্ত ও তানজিদ হাসান তামিম ৯৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে দলকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান। শান্ত খেলেন ৬৭ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস। অন্যদিকে তামিম করেন ৫৪ রান।

অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডিং এদিন ছিল হতাশাজনক। একাধিক ক্যাচ হাতছাড়া করে তারা বাংলাদেশের ব্যাটারদের সুযোগ করে দেয়। শান্ত যখন মাত্র ৯ রানে ছিলেন, তখন দ্বিতীয় স্লিপে তার সহজ ক্যাচ ফেলে দেন মার্নাস লাবুশেন। সেই ভুলের মাশুল পরে গুনতে হয়েছে সফরকারীদের।

মধ্য ওভারগুলোতে কিছুটা চাপে পড়লেও ইনিংসের শেষভাগে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের ঝড়ো ব্যাটিং বাংলাদেশের রানকে বড় সংগ্রহে পরিণত করে।

চার বছর পর ফিরে ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস

দীর্ঘ প্রায় চার বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর সুযোগ পেয়েই নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করলেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত।

ছয় নম্বরে নেমে মাত্র ৭০ বলে অপরাজিত ৮৬ রান করেন তিনি। ইনিংসটিতে ছিল সাতটি চার ও তিনটি ছক্কা। এটিই তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ইনিংস।

অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডাররা তাকে একাধিক জীবন দেন। চারটি ক্যাচ এবং দুটি রানআউটের সুযোগ হাতছাড়া করে তারা। কিন্তু সেই সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার করেন মোসাদ্দেক।

শেষদিকে তাসকিন আহমেদের ১৫ বলে ২০ রানের কার্যকর ইনিংসও বাংলাদেশের সংগ্রহকে ২৮৪ রানে পৌঁছে দিতে সহায়তা করে।

নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৮৪ রান তোলে বাংলাদেশ।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নাথান এলিস সর্বোচ্চ ৩ উইকেট নেন। এছাড়া ম্যাট রেনশ ও অভিষিক্ত লিয়াম স্কট দুটি করে উইকেট শিকার করেন।

প্রথম বলেই আঘাত

২৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।

ইনিংসের প্রথম বলেই ম্যাট শর্টকে বোল্ড করে দেন তাসকিন আহমেদ। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন উল্লাসের ঢেউ।

পরের ওভারেই মার্নাস লাবুশেনকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন মুস্তাফিজুর রহমান। আম্পায়ার প্রথমে আউট না দিলেও বাংলাদেশের সফল রিভিউয়ের ফলে ফিরে যেতে হয় লাবুশেনকে।

সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে লাবুশেনের ব্যাটিং ফর্ম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সাম্প্রতিক সিরিজেও তিনি ব্যর্থ ছিলেন। সেই হতাশা মিরপুরেও কাটাতে পারেননি।

নাহিদ রানার গতির সামনে অসহায় অস্ট্রেলিয়া

এরপর শুরু হয় নাহিদ রানার শো।

বাংলাদেশের এই তরুণ পেসার ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ধারাবাহিক বোলিং করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ভোগান।

বাংলাদেশ দলের বোলিং কোচ এবং সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার শন টেইটের তত্ত্বাবধানে নিজেকে গড়ে তোলা নাহিদ এদিন ছিলেন দুর্দান্ত।

অধিনায়ক জশ ইংলিসকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর অ্যালেক্স ক্যারিকেও আউট করেন তিনি। পরে আরও দুটি উইকেট নিয়ে ৪১ রানে ৪ উইকেট শিকার করেন।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে এটি কোনো বাংলাদেশি বোলারের সেরা বোলিং ফিগার।

অন্যদিকে মোসাদ্দেকও বল হাতে দুটি উইকেট নেন। পাশাপাশি অসাধারণ একটি ক্যাচ ধরে মাঠে নিজের উপস্থিতি জানান দেন।

প্রতিরোধ গড়েও পারল না অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ক্যামেরন গ্রিন অপরাজিত ৫২ রান করেন। এছাড়া অ্যালেক্স ক্যারি ৪৭ এবং কুপার কনোলি ৩৫ রান করেন।

তবে কেউই ইনিংস বড় করতে পারেননি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকায় ম্যাচে আর ফিরে আসতে পারেনি সফরকারীরা।

৪২.২ ওভারে ৯ উইকেটে ১৯১ রান থাকা অবস্থায় বজ্রপাত ও বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর ম্যাচ কর্মকর্তারা ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশকে ৮৬ রানের জয়ী ঘোষণা করেন।

হতাশ অস্ট্রেলিয়া

ম্যাচ শেষে হতাশা লুকাননি অস্ট্রেলিয়ার ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক জশ ইংলিস।

তিনি বলেন, “আমাদের মোট রান হতাশাজনক ছিল। আমরা চার-পাঁচটি ক্যাচ ফেলেছি। আমার মনে হয়েছিল, বাংলাদেশ যদি ২৩০-২৪০ রানের মধ্যে থাকত, তাহলে লক্ষ্য তাড়া করা সম্ভব ছিল। কিন্তু আমরা কোনো বড় জুটি গড়তে পারিনি। সব মিলিয়ে এটি হতাশাজনক একটি দিন।”

উইকেটরক্ষক ব্যাটার অ্যালেক্স ক্যারিও দলের পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

ক্যারি বলেন, “আমরা কোনো বিভাগেই ঠিকভাবে খেলতে পারিনি। ফিল্ডিং ছিল ঢিলেঢালা। ব্যাটিংয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো উইকেট হারিয়েছি। সিরিজ শুরু করার জন্য এটি ভালো উপায় নয়। তবে এখনও দুটি ম্যাচ বাকি আছে। আশা করছি আমরা দ্রুত ভুলগুলো শুধরে ঘুরে দাঁড়াতে পারব।”

কার্ডিফের স্মৃতি ফিরল মিরপুরে

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় সবসময়ই বিশেষ কিছু।

২০০৫ সালে কার্ডিফে মোহাম্মদ আশরাফুলের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটকে চমকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচটিকে এখনও বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয় হিসেবে ধরা হয়।

তারপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এ সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, বহু বড় দলকে হারিয়েছে, বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় আর আসেনি।

অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো মিরপুরে।

এই জয় বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে নাহিদ রানার মতো গতিময় পেসারের উত্থান বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এক সময় স্পিননির্ভর দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন পেস বোলিংয়েও বিশ্বমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম—মিরপুরের এই জয় তারই আরেকটি প্রমাণ।

আগামী বৃহস্পতিবার একই মাঠে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে আবার মুখোমুখি হবে দুই দল। সেই ম্যাচে জয় পেলে ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে বাংলাদেশ।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles