বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে একাধিক পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নেমেছে অস্ট্রেলিয়া। ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছে অলরাউন্ডার লিয়াম স্কটের। একই সঙ্গে দলে ফিরেছেন গতিময় পেসার জেভিয়ার বার্টলেট। অন্যদিকে ঘরের মাঠে শক্তিশালী পেস আক্রমণ নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার ম্যাচের টস জিতে অস্ট্রেলিয়ার ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক জশ ইংলিস প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্যে শুরু হওয়া ম্যাচটি তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম লড়াই। পুরো সিরিজই ঢাকায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে স্পিন-সহায়ক উইকেটে ২-১ ব্যবধানে হারতে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে। তবে মিরপুরে এসে তারা পেয়েছে ভিন্ন ধরনের উইকেট। মাঠ পর্যবেক্ষণের পর অস্ট্রেলিয়ার টিম ম্যানেজমেন্ট মনে করেছে, এবারের উইকেটে স্পিনের চেয়ে পেসাররা বেশি সুবিধা পেতে পারেন। চলতি বছরে এই উইকেটে অনুষ্ঠিত পাঁচটি ওয়ানডেতেও পেসারদের জন্য কিছুটা সহায়তা দেখা গেছে।
সেই বিবেচনায় একাদশ সাজিয়েছে সফরকারীরা। অভিষেক হওয়া লিয়াম স্কটের পাশাপাশি দলে জায়গা পেয়েছেন জেভিয়ার বার্টলেট। পাকিস্তান সিরিজে খেলা অলিভার পিক ও স্পিনার ম্যাথিউ কুহনেমানকে এই ম্যাচে বাইরে রাখা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওয়ানডে ক্যাপ নম্বর ২৫৩ পেয়েছেন স্কট। ম্যাচ শুরুর আগে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার সতীর্থ অ্যালেক্স কেরি তার হাতে অভিষেক ক্যাপ তুলে দেন। গত কয়েক মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি।
২০২৪-২৫ মৌসুমের ওয়ানডে কাপে ‘প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট’ নির্বাচিত হন স্কট। এরপর সর্বশেষ শেফিল্ড শিল্ড মৌসুমেও সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পান। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াকে দুটি শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতার পুরস্কার হিসেবেই জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন এই সিম-বোলিং অলরাউন্ডার।
অন্যদিকে বার্টলেটের প্রত্যাবর্তনও অস্ট্রেলিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আইপিএল ব্যস্ততার কারণে পাকিস্তান সিরিজে খেলতে পারেননি তিনি। এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি ওয়ানডে খেলেই ১৫ উইকেট শিকার করেছেন এই পেসার। তার বোলিং গড় ১১.১৩। তবে বিদেশের মাটিতে এটিই তার প্রথম ৫০ ওভারের আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারেও এসেছে পরিবর্তন। ম্যাট শর্টের সঙ্গে ওপেনিংয়ে পাঠানো হয়েছে কুপার কনোলিকে। অধিনায়ক ইংলিস নেমেছেন তিন নম্বরে। কনোলি সর্বশেষ ওয়ানডেতে ওপেন করেছিলেন গত বছরের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে তিনি শূন্য রানে আউট হন। তবে এরপর আইপিএলে পাঞ্জাব কিংসের হয়ে তিন নম্বরে ব্যাট করে নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র বিশেষজ্ঞ স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা। পিঠের সমস্যার কারণে কনোলির বোলিং ব্যবহার সীমিত রাখা হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনে ম্যাট শর্ট ও ম্যাথিউ রেনশর স্পিন বিকল্প হিসেবে কাজ করবেন।
পাকিস্তান সফরে ম্যাথিউ কুহনেমান ভালো বোলিং করলেও মিরপুরের উইকেটে অতিরিক্ত টার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছে অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকরা। লাহোরে যেমন বোলিং করে বাবর আজমকে বিপদে ফেলেছিলেন, তেমন পরিস্থিতি ঢাকায় নাও মিলতে পারে বলে তাদের ধারণা।
বাংলাদেশের একাদশেও রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়। উদ্বোধনী জুটিতে আছেন তানজিদ হাসান ও সাইফ হাসান। এরপর নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহীদ হৃদয়, লিটন দাস ও মোসাদ্দেক হোসেন ব্যাটিংয়ের দায়িত্ব সামলাবেন। অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ অলরাউন্ডার হিসেবে দলের অন্যতম ভরসা।
তবে সবচেয়ে বেশি নজর রয়েছে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের দিকে। তাসকিন আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান ও নাহিদ রানাকে নিয়ে গড়া এই আক্রমণকে সিরিজের অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সঙ্গে আছেন বাঁহাতি স্পিনার তানভীর ইসলাম।
বিশেষ করে তরুণ পেসার নাহিদ রানাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার আগ্রহ কম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের গতির ঝড় তুলে ইতোমধ্যেই আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি গতিতে নিয়মিত বল করার সক্ষমতা তাকে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের দ্রুতগতির বোলারদের মুখপাত্রে পরিণত করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের জন্য নাহিদ, তাসকিন ও মুস্তাফিজের সমন্বয়ে গড়া আক্রমণ বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে মিরপুরের উইকেটে নতুন বলে কিছুটা সহায়তা পাওয়া গেলে বাংলাদেশের পেসাররা ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম।
অন্যদিকে সফরকারীদের ব্যাটিং লাইনআপে অভিজ্ঞতার অভাব নেই। জশ ইংলিস, মার্নাস লাবুশেন, অ্যালেক্স কেরি, ক্যামেরন গ্রিন ও ম্যাট রেনশর মতো ক্রিকেটাররা দায়িত্ব সামলাবেন। তবে পাকিস্তান সফরে ব্যর্থ মার্নাস লাবুশেনকে নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আগের সিরিজে তার সংগ্রহ ছিল ০, ৫ ও ১৯ রান। তবুও টিম ম্যানেজমেন্ট তার ওপর আস্থা রেখেছে এবং চার নম্বরে ব্যাট করার দায়িত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজটি শুধু দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক সূচি ও আইসিসি টুর্নামেন্টের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে চায়। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া নতুন মুখদের পরীক্ষা করে ভবিষ্যতের দল গঠনের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে চায়।
তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শেষে দুই দল চট্টগ্রামে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে মুখোমুখি হবে। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্ব দেবেন নিয়মিত অধিনায়ক মিচেল মার্শ। ফলে এই সফরকে দুই দলের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

