তারেকের ১০০ দিনে ৬০৫ হত্যাকাণ্ড, ৩৪৯৬ নারী ও শিশু নির্যাতন

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে হত্যা, ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন, অপহরণ ও গণপিটুনির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে সুশাসন ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে জননিরাপত্তা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক রয়ে গেছে।

রোববার ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি তাদের “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকারের প্রথম ১০০ দিন: সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ” শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ছিনতাই, অপহরণ, ডাকাতি এবং গণপিটুনির মতো অপরাধের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৪৯৬টি। এছাড়া ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৭৮ থেকে ১০২টি, যার মধ্যে ৩০ থেকে ৩৬টি ছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে ৪৯ থেকে ৭১ জন শিশু।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হিসেবে টিআইবি গণপিটুনির ঘটনা তুলে ধরে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দুই মাসে ৬৯ থেকে ৮০টি গণপিটুনির ঘটনায় ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত এবং সর্বোচ্চ ১২৫ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া এই সময়ে ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ২ হাজার ২১৪টি চুরির ঘটনা ঘটেছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির জ্যেষ্ঠ গবেষক মো. জুলকারনাইন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর। প্রতিবেদনে বলা হয়, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের মতো অপরাধ বাড়তেই থাকছে। বিশেষ করে ঢাকায় সংঘটিত অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে কিশোর গ্যাং জড়িত, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, এই সময়কাল একদিকে আশাব্যঞ্জক, অন্যদিকে উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও হত্যা, ডাকাতি, চুরি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং গণপিটুনির মতো ঘটনা সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “তিন মাস পেরিয়ে গেলেও দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক এবং লজ্জাজনক।” তাঁর মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যকারিতা দুর্বল করা হলে দুর্নীতিবিরোধী লড়াই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস অতিক্রম করলেও দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করতে পারেনি। টিআইবির মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর উপস্থিতি ছাড়া জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, নির্বাচনী অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা এখনো প্রভাব বিস্তার করছে।

টিআইবি ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার উত্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে। ঢাকার শাহ আলী মাজারে হামলা এবং কুষ্টিয়ায় এক সুফি নেতার ওপর হামলার ঘটনা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষা খাত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই অপসারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এছাড়া প্রশাসনিক নিয়োগ ও ছাত্ররাজনীতিকেন্দ্রিক বিরোধকে ঘিরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা ও সহিংসতার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।

তবে সরকারের কিছু উদ্যোগের প্রশংসাও করেছে টিআইবি। কিশোর গ্যাং, সাইবার অপরাধ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে অভিযান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কারের উদ্যোগ এবং শিক্ষা প্রশাসনের উন্নয়নমূলক পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু সংস্থাটি মনে করে, বিচ্ছিন্ন কিছু পদক্ষেপ দিয়ে পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। জবাবদিহির ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং দুর্নীতিবিরোধী সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার অভাব সরকারের সংস্কার উদ্যোগকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও জননিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো সীমিত। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। টিআইবির মতে, কার্যকর জবাবদিহি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দুর্নীতিবিরোধী স্পষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া সরকারের সংস্কার কর্মসূচি কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনতে পারবে না।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles